এবারের মুক্তি ... মাইথন
গতানুগতিকতার থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় থেকে একটু হাপ ছাড়তে গত ২৫ শে জুলাই ২০১৯ রবিবার আমরা বেরিয়ে পরলাম। এবারের গন্তব্য বাঙালির অত্যন্ত পরিচিত মাইথন। রাঢ় বাংলা আর ঝাড়খণ্ডের বর্ডারে অবস্হিত এই মাইথন। আসানসোল স্টেশনে নেমে ৩০/৪৫ মিনিটের পথ। আমরা হাওড়া থেকে রবিবার সকালে ব্ল্যাক ডায়মন্ড ( হাওড়া- ধানবাদ ) এ করে , রওনা দিলাম। কাটায় কাটায় ৬.১৫ মিনিটে ট্রেন ছেড়ে দিল। যথা সময়ে আসানসোল পৌঁছলাম। কিন্তু আমরা ওই স্টেশনে না নেমে কয়েক স্টেশন পরে কুমারডুবি তে নামলাম। আগে ই জেনেছিলাম যে কুমার ডুবি থেকে মাইথনের দূরত্ব কম। কুমারডুবি ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত । আসানসোলের পর ই ট্রেন ঝাড়খণ্ডে ঢুকে পড়ে। প্রায় সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ স্টেশনে নেমে অটো করে আমরা মিনিট ১৫/২০ এর মধ্যে আমরা West Bengal Tourist lodge এ পৌঁছলাম। শহরের মধ্যে দিয়ে দোকান বাজার পেরিয়ে মাইথন ড্যামে যখন উঠলাম , তখন দামোদর নদের ব্যাপ্তি তে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না। ড্যামের যে দিকে জলাধার , সেদিকে ছোট ছোট একাধিক দ্বীপ দেখতে পেলাম। ওমন ই এক দ্বীপের মাঝে DVC এর পর্যটন লজ "মজুমদার নিবাস "। ছোট একটা ব্রীজ পেরিয়ে ওই লজে প্রবেশ করতে হয়। এ সব পেরিয়ে , ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর বাংলো যাওয়ার রাস্তা ছাড়িয়ে ছোট্ট টীলার ওপর টুরিস্ট লজে এসে পৌঁছলাম। লজের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বেশ শান্ত। পিছনে জঙ্গল , সামনে লজের বাগান , বাগান সংলগ্ন কয়েক টি কটেজ ( কটেজে সিঁড়ি দিয়ে একটু নীচে নেমে ঢুকতে হয়), বাগান এর সামনে , নীচে ফাঁকা জমি পেরিয়ে বিস্তত দামোদরনদ , মধ্যে মধ্যে জেগে থাকা দ্বীপ , জল থেকে মাথা তুলে দাড়ানো ছোট ছোট পাহাড়....পাড়ে বাঁধা ডিঙ্গি নৌকা।পরে শুনলাম ওই নৌকা পর্যটকদের নৌবিহারের জন্য রাখা আছে। স্পীড বোট ও রয়েছে।
মাইথন শব্দটি এসেছে মায়ের থান .. এই শব্দের অপভ্রংশ থেকে। এখানে কাছেই মা কল্যাণীশ্বরী র মন্দির। এর নামেই জায়গার নামকরণ । মা খুব ই জাগ্রত। সন্তানহীনা জননীর দুঃখ দূর করেন।
আমাদের ঘরটি ছিল দোতলায়। চওড়া বারান্দা র একপাশে। বিশাল ঘরের লাগোয়া বাথরুম, ড্রেসিং রুম ও কাচঘেরা নিজস্ব বারান্দা । সামনে বিস্তৃত দামোদর নদ। এই সেই বিখ্যাত নদী যা একসময় ছিল বাংলার দুঃখ। কথিত আছে .. " দামোদরের এলো বাণ , ডুবল শহর বর্ধমান।" শুধু বর্ধমান নয় সংলগ্ন এলাকা ভাসিয়ে ভয়াবহ বন্যা হতো। পরবর্তী কালে কয়েক টি বাঁধ নির্মাণ করে সেই ভয়াভয়তার কবল থেকে মুক্তি মেলে। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) এর তৈরি বাঁধ গুলির মধ্যে মাইথন ড্যাম অন্যতম। আরো একটা কারণে সেই ছোট বেলা থেকেই এই নদীর নাম আমাদের চেনা .... হ্যাঁ , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন , মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য।
বাঙালির জীবনে আরেক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ উত্তম ময় চলচ্চিত্র জগত। হ্যাঁ, উত্তম কুমার। এখানে এসে জানলাম "শঙ্খবেলা " সিনেমার সেই নৌকায় উত্তম-মাধবী জুটির অসাধারণ গানের ভিতর দিয়ে রোমান্টিক প্রশ্নের উত্থাপন ' কে প্রথম কাছে এসেছি ? কে প্রথম চেয়ে দেখেছি? কিছুতেই পাই না ভেবে , কে প্রথম ভালোবেসেছি !! তুমি না আমি ?".... এই গানের চিত্রায়ণ এই দামোদর নদের বুকে ই। সেই নৌকা বহুদিন যত্নে রক্ষা করেছিল সেই সৌভাগ্যবান মাঝি... এ তথ্য আমার এক মামীর কাছে শুনেছি। ওই সময়ে তিনি মামার সাথে ওদিকে ই থাকতেন। মামার কর্মস্থল ছিল সীতারাম পুর।
দুপুরে গরম গরম মাংস ভাত খেয়ে উঠে , একটু আসেপাশে ঘোরাফেরা করার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবাই লম্বা ঘুম দিলাম। সন্ধ্যায় অন্ধকার নেমে চারিদিক যখন নিস্তব্ধ , তখন নামল অঝোর ধারায় বৃষ্টি ... বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই নৈঃশব্দ কে ছাপিয়ে যাওয়া ঝিঁঝিঁ র কনসার্ট শুনতে শুনতে আর বিদ্যুৎ চমকের মধ্যে দৃশ্যমান জলের রেখার আভাস দেখতে দেখতে কখন যেন রাতের খাবারের সময় এসে গেলো। সন্ধ্যায় যদিও চায়ের সঙ্গে অল্প গরমাগরম চিকেন পাকোড়া ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া হয়েছিল ... কিন্তু বেড়াতে বেরলে আমার ক্ষিদে একটু বেশি ই পায় !!!
রাতের খাবারের পালা শেষ করে , একটু জলদি ই আমরা শুয়ে পড়লাম, পরেরদিন একটু ঘোরার প্ল্যান রয়েছে। খুব ভোরে ওঠার তাড়া নেই। বেড়াতে এলে মনটার সত্যিই একটু মুক্তি মেলে। সাতসতের কাজের থেকে মুক্তি।
পরদিন সকালে চা পেতে একটু দেরি হলো। আমরা একমাত্র বোর্ডার .... তাই টুরিস্ট লজের কর্মীরা ও একটু আয়েশ করে দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছেন। একদুজন রাতে লজেই থাকেন ও ম্যানেজার লজ সংলগ্ন কোয়ার্টারে থাকেন বাকিরা কাছাকাছি থাকেন। এখানকার স্টাফদের অধিকাংশ ই বাইকে যাতায়াত করেন। ব্যাবহার খুবই ভালো।
জলখাবার খেয়ে নিয়ে আমরা ম্যানেজারের ঠিক করা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই গেলাম মা কল্যাণীশ্বরী মন্দির দর্শন করতে। ছিমছাম , ছোট্ট মন্দির। পূজো দেওয়া নয় , দর্শন ই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। পূজো দেওয়ার অনুরোধ এসেছে, কিন্তু তা বিরক্তি উদ্রেক করেনি। মন্দির চত্বরে পায়রা দের অবাধ বিচরণ । দর্শনার্থীদের ভিড় দেখলাম তাদের কিছু মাত্র বিচলিত করছে না। বেশ লাগল। মায়ের দর্শন করে নির্বিঘ্নে আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। এবার আমাদের গন্তব্য snake park হয়ে পাঞ্চেত ড্যাম দেখে নিয়ে , পুরুলিয়া জেলার গড়পঞ্চকোট ।সেখান থেকে আবার মাইথন ফেরা।
আমরা snake park এ পৌঁছলাম। একটু হতাস হলাম ওখানে গিয়ে । অজ্ঞাত কোন কারণে , ওখানে কোন সাপের দেখা মেলে নি। শুনলাম সাপ আগে ছিল। এখন জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হয়তো বা Forest Department এর তরফ থেকে কোনো বাধা আছে ... জানা নেই।
এবার আমাদের গন্তব্য পাঞ্চেৎ ড্যাম। কিছু ক্ষণের মধ্যে ই আমরা ড্যাম দেখতে পেলাম। ড্যামে ওঠার বেশ খানিকটা আগে গাড়ি থেকে নেমে চারদিকটা দেখে মুগ্ধ হলাম। দামোদর নদের বিস্তার ... জলে আকাশের মেঘের প্রতিফলন , তীরে বাঁধা ডিঙি নৌকা সব ই যেন পটে আঁকা ছবি। ওখানে পাশেই একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নদীর কাছে। সেখানে আমরা তিনজনে নেমে একটু জল মাথায় ছুঁইয়ে এলাম। ঝকঝকে রোদের গরমে জলের শীতল পরশ বড়ো ভালো লাগলো। ওপরে এসে আসেপাশের কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করলাম। এবার গাড়ি এগিয়ে চলল ড্যাম পেরিয়ে গড় পঞ্চকোটের উদ্দেশ্যে।
গড়পঞ্চকোট নামের মধ্যে ই যেন ইতিহাসের গন্ধ রয়েছে। কিন্তু তেমনভাবে ইতিহাসের খোঁজ পাওয়া ই গেলো না। এখানেই আমরা পিছিয়ে রয়েছি। যদিও পর্যটন শিল্পের অনেক উন্নতি আমাদের রাজ্যে হয়েছে, কিন্তু আরো যত্নবান হওয়া বোধহয় উচিত। অন্য কিছু সূত্রে সামান্য কিছু সন্ধানে সক্ষম হলেও মন ভরলো না। জানলাম , একসময় পাঞ্চেৎ পাহাড়ে একটি কেল্লা ছিল। যা মারাঠা দস্যু বর্গীদের দ্বারা বারংবার আক্রান্ত হয়, ওই কেল্লা বা গড়ের রাজার মৃত্যু হয়। রাজার সাত রানী স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করেন। কেল্লা ও ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। তখন বাংলায় নবাব আলীবর্দী খাঁর সময়কাল।
ওখানে পৌঁছে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কিছু ধ্বংসাবশেষ দেখলাম। সংরক্ষণের অভাবের ছাপ ছড়িয়ে আছে। একমাত্র রাধাকৃষ্ণ মন্দির টি অক্ষত রয়েছে। কাছে ই একটি watch tower রয়েছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছিল, অগত্যা tower এ ওঠা মুলতবি রেখে, আমরা ফেরার পথ ধরলাম। আসা যাওয়ার রাস্তা ভালোই। হোটেলে ফিরে সেদিন আর আমরা কোথাও বেড়াতে গেলাম না।
পরেরদিন সকালে নৌকা ভ্রমণ না করলেই নয়। চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এক হোটেল কর্মীর ভাই এর নৌকা। নদীর ধারের অখ্যাত এক ঘাটে পৌঁছলাম .... সে অভিজ্ঞতা ও বেশ অন্যরকম। হোটেল থেকে বেরিয়ে দেখি আমাদের ঘাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুটো বাইক হাজির। বোঝো !! এ তো আর সপ্তপদী রাইড নয় !!! ভয়ে ভয়ে সামনের বাইকে একটু টালবাহানার পর আমি আর আমার কন্যা উঠলাম চালকের পিছনে আর অন্য বাইকে আমার কর্তাকে নিয়ে চালক দ্বয় রওনা দিলো। উঁচু ,নীচু , আবার উঁচু ... এভাবে একজায়গায় রাস্তা শেষ হলো। এখানে ও চমক। আমরা নামলাম ব্রিটিশ রাজের তৈরি , পরিত্যক্ত এক Boat club এর সামনে। হোটেল কর্মচারী র কাছে ই শুনলাম .... অতীতের এই Club এর বর্ণাঢ্য সব নৌ প্রতিযোগিতার কথা। নববর্ষের উদযাপন এর অনুষ্ঠানের কথা। সত্যিই অদ্ভুত এই ইংল্যান্ড এর অধিবাসী বৃন্দ.... সুদূর ইংল্যান্ড থেকে শুধু মাত্র বাণিজ্য করতে এসে ,দেশ দখলকারী হিসেবে আমাদের পরাধিনতার গ্লানিতে ডুবিয়েছিল... এ যেমন সত্য , তেমন ই তাদের থেকে অনেক কিছু ই , যা ভালো, শিক্ষনীয় তার আমরা নিয়েছি এ যাবৎ। নিয়ে চলেছি ও। জীবনকে উপভোগ করতে জানতো ব্রিটিশরা।
ওই ক্লাব হাউসের মধ্যে দিয়ে গিয়েই পুরোনো পরিত্যক্ত একটা সিঁড়ি পেলাম। বৃষ্টি ভেজা স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা মাখা পথ ধরে সাবধানে নিচে নেমে এলাম ... নৌকা আগেই ওখানে এসে গিয়েছিল। একে একে তিনজনে নৌকায় উঠে সামলে বসে দামোদর নদে নৌবিহার শুরু হলো। হাল্কা স্রোতের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের মধ্যে নৌকা এগিয়ে চলল। বেশ লাগছিল। একসময় আমরা নদের মাঝের সবুজদ্বীপে পৌঁছলাম। পর্যটকদের আনাগোনা র প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে , দেখলাম যত্রতত্র... সেদিন আমরা তিনজন ছাড়া আর কোন পর্যটক তখনো ওখানে আসেননি। কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে আবার নৌকা করে ফিরলাম। ফিরতি পথে নদের একজায়গায় জাল দিয়ে ঘিরে রাখা মৎস চাষের ব্যবস্থা ও দেখলাম। অন্য জায়গা থেকে ছোট মাছ এনে পুষ্টিকর খাবার খাইয়ে নানা ধরনের research work এর মাধ্যমে তাদের বড় করা হয়। এদের ব্যবহার করা হয় pisciculture (fish farming )এ। সে সব ও অল্প সল্প কিছু জানার পর , আমরা লজে ফিরে জলখাবার খেয়ে , বেরিয়ে পরলাম।
সেদিন বিকেলে ই ফেরার ট্রেন। আমরা আসানসোল এ এক দাদার বাড়ি তে জমিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন ... শয়ন সবের পরে , রওনা দিলাম স্টেশন। তারপর !!! আবার থোড় বড়ি খাড়ার মধ্যে দিনের শেষে ফিরে এলাম। সেই আমার শহর , আমার পাড়া ... অবশেষে আমাদের বাড়ি।
@শুচিস্মতাভদ্র
No comments:
Post a Comment