Tuesday, 18 November 2025

হঠাৎ করে হলদিয়া

 আমরা হঠাৎ করে একদিনের জন্য হলদিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, এই মাসের প্রথম সপ্তাহে। একদিনের জন্য মন্দ না। আমরা কলকাতা থেকে দুই পরিবার একটা গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ি থেকে অল্প জলখাবার খেয়ে প্রায় সকাল ১০.৩০ নাগাৎ র‌ওনা দিলাম। বেলা ১২ নাগাৎ কোলাঘাট এর শের -এ -পাঞ্জাব ধাবায় চা এবং টা পান বিরতির পর আরও ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আমরা সরকারি guest house হলদিয়া আবাসনে পৌঁছলাম। 

Guest house এর সামনের রাস্তা পেরিয়ে রাস্তা গেছে নদীর দিকে বেঁকে। Guest house এর ভিতর শীতের মরসুমী ফুলের বাগান দেখার মতো। উল্টো দিকে নদীতে একটা বিদেশী জাহাজ নোঙর করা ছিল। কাছেই জেটিতে চলছিল মাল নামানোর কাজ। জাহাজ সম্ভবত ছিল Middle East এর। উর্দু হরফে নাম লেখা ছিল জাহাজের গায়ে।

আমরা একটু fresh হয়ে, দুপুরের খাবারখেয়ে সোজা  নদীর ধারে বেড়াতে গেলাম। প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে অন‍্য সব ই বড় মেকি। নদীর ঠান্ডা হাওয়ায় একটু একটু শীত করলেও,  লাগছিল বেশ। ওখানে বসার জন্য সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চে বসে, ছবি তুলে বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল।এরপর গাড়ি নিয়ে আশপাশে একটু ঘুরে , আমরা guest house এ ফিরে এলাম। বারান্দা থেকে নদী, নোঙর করা জাহাজ,আরো চলমান বেশ কিছু জাহাজ ও দেখলাম। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে, সন্ধ্যা বেলায় আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে হলদিয়া র river side বলে পরিচিত সুন্দর ভাবে সাজানো গোছানো একটা জায়গায় গেলাম , শহরের মধ্যে দিয়ে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সরকারি আবাসন আমাদের কলকাতার salt lake এর কথা মনে পড়াচ্ছিল। নদীর ধারে হাল্কা আলোয় মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। অল্পক্ষণ ঘুরে, ধূমায়িত চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে, আমরা guesthouse এ ফিরে এলাম। রাতে কুয়াশা র চাদরে guest house. এর বাগান দেখে horror movie তে দেখা দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে ‌উঠছিল। দূর্ভেদ্য কুয়াশা মেখে নোঙর করা জাহাজ ও চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। জাহাজের ভোঁ জানান দিচ্ছিল তার উপস্থিতি।

পরেরদিন জলখাবার খেয়ে , সকলে স্নান করে নিয়ে guesthouse এর বাগানে আর নদীর ধারে অনেকক্ষণ কাটিয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে হলদিয়া থেকে বেরিয়ে পড়লাম , পথে দেখলাম মহিলাদল রাজবাড়ী। রাজবাড়ী আছে বর্তমানে দুই টি। ইতিহাস বলে তিনটি.....যার মধ্যে প্রথমটির কোনো অস্তিত্ব ই নেই। প্রাচীন রাজবাড়িটি প্রায় পরিত‍্য‌ক্ত। তুলনামূলকভাবে নতুন রাজবাড়িটি সুন্দর ভাবে রক্ষিত। সেখানে রাজাদের ব‍্যবহৃত দ্রব‍্য‌াদি,ব‌ই, শিকার করা পশু, পাখি নিয়ে রয়েছে একটি সংগ্রহশালা। রাজবাড়ির বিশাল এলাকার মধ্যে রয়েছে মন্দির, পুকুর, পরিত‍্যক্ত প্রাসাদ। 

রাজবাড়ির বর্তমান সদস‍্যরা কলকাতার বাসিন্দা। তাদের এখানে আসা যাওয়া বজায় আছে নিয়মিত ভাবে ই। এই রাজ পরিবার মুঘল আমলের। অনেক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে,আজ ও তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই রাজপরিবারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে নতুন রাজবাড়ির দরবার কক্ষের প্রবেশদ্বারের পাশে।

একদিনের জন্য খুব ই ভাল একটা ‌weekend destination.....

Thursday, 13 November 2025

মুর্শিদাবাদে দু রকম

 আমাদের স্কুল বাস যখন আমাদের সাবালকত্বের দরজায় পৌঁছেই দিল ( বাস সার্ভিস বন্ধ হল ) , তখন আমি স্কুলের পথে এগিয়ে গেলাম বেসরকারি বাসের সহায়তায় । এখানে আমার দুই সঙ্গী ছিল । দেবযানী আমার বান্ধবী আর এক ক্লাসের জুনিয়র সোমা । 

সোমার পাড়াতুত দিদি রিন্তা দির সাথে ওখানেই আলাপ। সোমাদের পাড়ায় ছিল রিন্তাদির মামা বাড়ি । সোমাদের বাড়ি ছিল পশ্চিম পুটিয়ারী আর দেবযানীর বাড়ি পূর্ব পুটিয়ারি ।

তো সেই রিন্তাদি কে বহুবছর পেরিয়ে সামনে পেলাম আমাদের মুর্শিদাবাদগামী ভাগিরথী এক্সপ্রেসের কম্পার্টমেন্টে । মাকে নিয়ে দিদি ফিরছিল জিয়াগঞ্জের কর্মক্ষেত্রে । 

এক শুক্রবার রাতে আমরা মুর্শিদাবাদ পৌঁছলাম। ট্রেনে অনেক প্ল্যান হল একসাথে ঘোরার । শনিবারে নিজের মতন ঘুরব দেবা-দেবী । সকাল থেকে সেই মতোই প্রদীপ মালাকার চলে এল ফূর্তিকে নিয়ে । ফূর্তি হল টাঙ্গার অন্যতম চালিকা মহিলা ঘোড়া । তারপর টগবগিয়ে একে একে সব দেখা হল ... বেলা গড়াল দুপুরে ... তারপর বিকেলে ... সন্ধ্যার সময় ক্লান্ত আমরা ঘরে ফিরলাম। লোকেশনের দিক থেকে হোটেল মঞ্জুশা অসাধারণ !!! সামনে বাগান । বাগান এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগিরথী , নিজস্ব ঘাট ... এক পাশ দিয়ে দৃশ্যমান হাজারদয়ারীর কিয়দংশ। 

রাত ৯ নাগাদ আগমণ রিন্তাদি সহ অসীম দা, সেই দিন প্রথম আলাপ হল দাদার সাথে । অনেক গল্পের পর ঠিক হল ... বাদ বাকি সব দেখা দেখি সকালে মিটিয়ে পরের দিন দুপুরের পর আমরা চলে যাব জিয়াগঞ্জের দিকে ওদের ডেরায় । 

টাঙ্গার জার্নি এতোটাই মনের মতন ছিল ... তাড়াও নেই তেমন ... আমরা ফূর্তির সাথে দুপুরের খাবারের পাট মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জিয়াগঞ্জের উদ্দেশ্যে । ৩টে নাগাদ পৌঁছে দেখি তেনারা দুজনেই ডিউটিরত । আমরা মাসিমার কাছে না গিয়ে , সরাসরি অসীম দার রুমে গেলাম। B.M.O.H ( Block Medical Officer Health ) এর অফিসে বসার সাথে সাথেই একজন এসে বললেন ... " স্যার আছেন ওটিতে , আপনারা আসুন ।" 

সেই প্রথম ওটি প্রবেশ আমার। শহুরে অপারেশন থিয়েটার এর সাথে তফাত বিশাল। তা পরবর্তী কালে পুপের আগমনের সময় বুঝেছিলাম । 

বিশাল এক গড়ের মাঠের মতন হল ঘরের মধ্যেই অসংখ্য বেড , অসংখ্য অপারেশনের রুগী ... অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ আর অদ্ভুত এক মিশ্র গন্ধ ( ওষুধ সহ আরো অজানা কিছুর মিশ্রণ ) 

আমার শরীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সূত্রপাতের ছায়া বোধহয় মুখে ফুটে উঠেছিল .... ওটির পোশাকে অসীম দা এগিয়ে এসে , আমাকে দেখেই বলল ... " তোমার বোধহয় কষ্ট হচ্ছে !!! বাইরে আমার ঘরেই বসো , আমি আসছি একটু পরেই। " 

পরে আমরা ওদের কোয়ার্টারেও গেলাম। কিছু পরেই বেরিয়ে পড়লাম সবাই মিলে অসীমদার গাড়িতে .... রাণী ভবানীর চার বাঙলা মন্দির দেখতে , নদী পেরিয়ে। গাড়ি রইল নদীর ওপারে , ব্রীজ ছিল না তখন , নৌকা করে পারাপার হোতো । 

ফিরে গল্প জমে উঠল ওদের কোয়ার্টারে । রিন্তাদির শাড়ির সংগ্রহ অসাধারণ। মন্দির দেখে ফেরার পথে রিন্তাদি আর অসীম দার তত্ত্বাবধানে শাড়িও কেনা হল । এমনকি টাকা কম পড়িয়াছিল , অসীম দা কিছুতেই শুনল না সাথে রিন্তাদির জোরাজুরিতে নেওয়া হল শাড়ি ... স্বর্ণচরি । ফিরে এসে মানিঅর্ডার আর চিঠি লিখেছিলাম অসীমদাকে । তখন জি পে কোথায় ??

রিন্তাদির কাছেই প্রথম জেনেছিলাম...বালুচরি , স্বর্ণচরির আসল দেশ বিষ্ণুপুর নয় , আদি দেশ এই অঞ্চল, যার নাম একদা ছিল বালুচর । নবাবের বেগম যে নক্সার শাড়ি পরবেন তা যাতে অদ্বিতীয় থাকে , তাই একখান শাড়ি তৈরির পরেই তাঁতির আঙুল কেটে দেওয়া হত ... আতঙ্কিত তাঁতি পরিবার দেশ ছাড়তে শুরু করল । তারা জাকিয়ে বসল বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে । কালের গর্ভে চাপা পড়ল বালুচর । আর সেই বালুচরের বালুচরিতে নাম কিনল বিষ্ণুপুর ।  

 তিন খান শাড়ি বগলদাবা করে ওদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল । তারপর খাই দাই পাঠ মিটতে মিটতে হল রাত সাড়ে দশটা । কলকাতা নয় , কাজেই বেশ রাত । খাওয়ার পর বেরলাম ... অসীম দা শুরুতেই স্পীড তুলে দিল তুঙ্গে ... এটা বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েও দেখেছিলাম। ভয় করলেও, তখন বয়সটা অনেক কম , তাই একটু পরেই ভয় চলে গেল । স্টেট হাইওয়ে দিয়ে চলেছি , বৈদ্যুতিক পোস্ট নেই বা থাকলেও আলো নেই ... চরাচর ব্যপ্ত চাঁদের আলো । হঠাৎই অসীমদা গাড়ি থামিয়ে , স্টার্ট বন্ধ করে দিলো ... বলল ... এবার দেখো । 

মুগ্ধ হয়ে দেখলাম ... বাঁপাশে দাঁড়িয়ে বিশাল কাটরা মসজিদ চত্বর...ঘড়িতে তখন ঠিক রাত ১১ টা । চাঁদের আলোয় কাটরা মসজিদ !!! কি যে অপূর্ব লাগছিল ... বলে বোঝানো যাবে না । রাস্তার ওপরেও আরো একবার গাড়ি থামিয়ে ছিল .... ১১ টা পেরিয়ে আরো কিছু পরে আমরা ফিরলাম হোটেলে । 

পরেরদিন আরো কিছু ঘোরাঘুরির পর্ব চলল ... কাসিমবাজার রাজবাড়ি ও আর্মেনিয়াণ চার্চ , সমাধিস্থল । সে সবও প্রদীপের টাঙ্গা করেই ঘুরেছিলাম । 

আমার সহকর্মী বেবীদির দিদির বাড়ি মুর্শিদাবাদে। দিদি নেই অনেক বছর । জামাইবাবুর পরিবার ওখানকার জমিদার । তিনিও আমাদের সাথে এসে দেখা করেছিলেন । পরের বার যখন পুপেকে নিয়ে গিয়েছিলাম, মনোজদা আমাদের সাথে পুরোটাই ছিলেন । বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে গল্প পরে হবে কখনো । 

দুবার মুর্শিদাবাদ গিয়ে , দু রকম গল্প নিয়ে ফিরেছি । দুটোর কোনটাই কম আকর্ষণীয় নয় ।