আমাদের স্কুল বাস যখন আমাদের সাবালকত্বের দরজায় পৌঁছেই দিল ( বাস সার্ভিস বন্ধ হল ) , তখন আমি স্কুলের পথে এগিয়ে গেলাম বেসরকারি বাসের সহায়তায় । এখানে আমার দুই সঙ্গী ছিল । দেবযানী আমার বান্ধবী আর এক ক্লাসের জুনিয়র সোমা ।
সোমার পাড়াতুত দিদি রিন্তা দির সাথে ওখানেই আলাপ। সোমাদের পাড়ায় ছিল রিন্তাদির মামা বাড়ি । সোমাদের বাড়ি ছিল পশ্চিম পুটিয়ারী আর দেবযানীর বাড়ি পূর্ব পুটিয়ারি ।
তো সেই রিন্তাদি কে বহুবছর পেরিয়ে সামনে পেলাম আমাদের মুর্শিদাবাদগামী ভাগিরথী এক্সপ্রেসের কম্পার্টমেন্টে । মাকে নিয়ে দিদি ফিরছিল জিয়াগঞ্জের কর্মক্ষেত্রে ।
এক শুক্রবার রাতে আমরা মুর্শিদাবাদ পৌঁছলাম। ট্রেনে অনেক প্ল্যান হল একসাথে ঘোরার । শনিবারে নিজের মতন ঘুরব দেবা-দেবী । সকাল থেকে সেই মতোই প্রদীপ মালাকার চলে এল ফূর্তিকে নিয়ে । ফূর্তি হল টাঙ্গার অন্যতম চালিকা মহিলা ঘোড়া । তারপর টগবগিয়ে একে একে সব দেখা হল ... বেলা গড়াল দুপুরে ... তারপর বিকেলে ... সন্ধ্যার সময় ক্লান্ত আমরা ঘরে ফিরলাম। লোকেশনের দিক থেকে হোটেল মঞ্জুশা অসাধারণ !!! সামনে বাগান । বাগান এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগিরথী , নিজস্ব ঘাট ... এক পাশ দিয়ে দৃশ্যমান হাজারদয়ারীর কিয়দংশ।
রাত ৯ নাগাদ আগমণ রিন্তাদি সহ অসীম দা, সেই দিন প্রথম আলাপ হল দাদার সাথে । অনেক গল্পের পর ঠিক হল ... বাদ বাকি সব দেখা দেখি সকালে মিটিয়ে পরের দিন দুপুরের পর আমরা চলে যাব জিয়াগঞ্জের দিকে ওদের ডেরায় ।
টাঙ্গার জার্নি এতোটাই মনের মতন ছিল ... তাড়াও নেই তেমন ... আমরা ফূর্তির সাথে দুপুরের খাবারের পাট মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জিয়াগঞ্জের উদ্দেশ্যে । ৩টে নাগাদ পৌঁছে দেখি তেনারা দুজনেই ডিউটিরত । আমরা মাসিমার কাছে না গিয়ে , সরাসরি অসীম দার রুমে গেলাম। B.M.O.H ( Block Medical Officer Health ) এর অফিসে বসার সাথে সাথেই একজন এসে বললেন ... " স্যার আছেন ওটিতে , আপনারা আসুন ।"
সেই প্রথম ওটি প্রবেশ আমার। শহুরে অপারেশন থিয়েটার এর সাথে তফাত বিশাল। তা পরবর্তী কালে পুপের আগমনের সময় বুঝেছিলাম ।
বিশাল এক গড়ের মাঠের মতন হল ঘরের মধ্যেই অসংখ্য বেড , অসংখ্য অপারেশনের রুগী ... অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ আর অদ্ভুত এক মিশ্র গন্ধ ( ওষুধ সহ আরো অজানা কিছুর মিশ্রণ )
আমার শরীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সূত্রপাতের ছায়া বোধহয় মুখে ফুটে উঠেছিল .... ওটির পোশাকে অসীম দা এগিয়ে এসে , আমাকে দেখেই বলল ... " তোমার বোধহয় কষ্ট হচ্ছে !!! বাইরে আমার ঘরেই বসো , আমি আসছি একটু পরেই। "
পরে আমরা ওদের কোয়ার্টারেও গেলাম। কিছু পরেই বেরিয়ে পড়লাম সবাই মিলে অসীমদার গাড়িতে .... রাণী ভবানীর চার বাঙলা মন্দির দেখতে , নদী পেরিয়ে। গাড়ি রইল নদীর ওপারে , ব্রীজ ছিল না তখন , নৌকা করে পারাপার হোতো ।
ফিরে গল্প জমে উঠল ওদের কোয়ার্টারে । রিন্তাদির শাড়ির সংগ্রহ অসাধারণ। মন্দির দেখে ফেরার পথে রিন্তাদি আর অসীম দার তত্ত্বাবধানে শাড়িও কেনা হল । এমনকি টাকা কম পড়িয়াছিল , অসীম দা কিছুতেই শুনল না সাথে রিন্তাদির জোরাজুরিতে নেওয়া হল শাড়ি ... স্বর্ণচরি । ফিরে এসে মানিঅর্ডার আর চিঠি লিখেছিলাম অসীমদাকে । তখন জি পে কোথায় ??
রিন্তাদির কাছেই প্রথম জেনেছিলাম...বালুচরি , স্বর্ণচরির আসল দেশ বিষ্ণুপুর নয় , আদি দেশ এই অঞ্চল, যার নাম একদা ছিল বালুচর । নবাবের বেগম যে নক্সার শাড়ি পরবেন তা যাতে অদ্বিতীয় থাকে , তাই একখান শাড়ি তৈরির পরেই তাঁতির আঙুল কেটে দেওয়া হত ... আতঙ্কিত তাঁতি পরিবার দেশ ছাড়তে শুরু করল । তারা জাকিয়ে বসল বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে । কালের গর্ভে চাপা পড়ল বালুচর । আর সেই বালুচরের বালুচরিতে নাম কিনল বিষ্ণুপুর ।
তিন খান শাড়ি বগলদাবা করে ওদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল । তারপর খাই দাই পাঠ মিটতে মিটতে হল রাত সাড়ে দশটা । কলকাতা নয় , কাজেই বেশ রাত । খাওয়ার পর বেরলাম ... অসীম দা শুরুতেই স্পীড তুলে দিল তুঙ্গে ... এটা বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েও দেখেছিলাম। ভয় করলেও, তখন বয়সটা অনেক কম , তাই একটু পরেই ভয় চলে গেল । স্টেট হাইওয়ে দিয়ে চলেছি , বৈদ্যুতিক পোস্ট নেই বা থাকলেও আলো নেই ... চরাচর ব্যপ্ত চাঁদের আলো । হঠাৎই অসীমদা গাড়ি থামিয়ে , স্টার্ট বন্ধ করে দিলো ... বলল ... এবার দেখো ।
মুগ্ধ হয়ে দেখলাম ... বাঁপাশে দাঁড়িয়ে বিশাল কাটরা মসজিদ চত্বর...ঘড়িতে তখন ঠিক রাত ১১ টা । চাঁদের আলোয় কাটরা মসজিদ !!! কি যে অপূর্ব লাগছিল ... বলে বোঝানো যাবে না । রাস্তার ওপরেও আরো একবার গাড়ি থামিয়ে ছিল .... ১১ টা পেরিয়ে আরো কিছু পরে আমরা ফিরলাম হোটেলে ।
পরেরদিন আরো কিছু ঘোরাঘুরির পর্ব চলল ... কাসিমবাজার রাজবাড়ি ও আর্মেনিয়াণ চার্চ , সমাধিস্থল । সে সবও প্রদীপের টাঙ্গা করেই ঘুরেছিলাম ।
আমার সহকর্মী বেবীদির দিদির বাড়ি মুর্শিদাবাদে। দিদি নেই অনেক বছর । জামাইবাবুর পরিবার ওখানকার জমিদার । তিনিও আমাদের সাথে এসে দেখা করেছিলেন । পরের বার যখন পুপেকে নিয়ে গিয়েছিলাম, মনোজদা আমাদের সাথে পুরোটাই ছিলেন । বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে গল্প পরে হবে কখনো ।
দুবার মুর্শিদাবাদ গিয়ে , দু রকম গল্প নিয়ে ফিরেছি । দুটোর কোনটাই কম আকর্ষণীয় নয় ।
No comments:
Post a Comment