শীতের এখন তখন
কদিন বেশ জম্পেশ করে শীত পড়েছে।ছুটির ওপর আপাতত ফুলস্টপ।আবার ছুটির আমেজ এ মাসের শেষে,তবে সবটাই পরিস্থিতির অধীন।ঘরে ঘরে এখন ঘোরতর জ্বরো জ্বরো রব।হাঁচি কাশির দখলে গোটা শহর।কোনটা সাধারণ আর কোনটা অসাধারণ কে জানে?ওসব বিপদের কথা থাক আপাতত। হঠাৎই মুঠোফোনের আঙিনায় আমার কলেজের বান্ধবী মনীষার একখান মন ছোঁয়া লেখা পড়ে ভারি স্মৃতি মেদুর হয়ে পড়লাম।বিষয়....আমাদের ছোটবেলার বড়দিন ও শীতের ছুটি.. ।
ভাবলাম, আমার নিজস্ব স্মৃতির ঝাঁপিতে একটু উঁকি মারলে কেমন হয় ??ওই লেখাটার অনেকখানিই যেন চেনা চেনা গন্ধ মাখা।তবে কিছু তো অচেনা হবেই।যেমন পূজোর প্যাণ্ডলে সবাই দশভূজার আরাধনা করেন একই আঙ্গিকে, কিন্তু প্রতিটি পূজোর ধরণধারণ স্বতন্ত্র। এও তাই।আমাদের সময়টা একই, কিন্তু কিছু কিছু ভিন্নতা পরিবেশের হাত ধরে রয়েছে,যেখানে আমাদের কারো হাত নেই।
আমাদের ছোটকালে শীতের ছুটি একই রকম ভাবে উপহার বিহীন বড়দিন,তুহিনা লোশন্, পণ্ডস্ কোল্ড ক্রিম, শিশি বন্দী গ্লিসারীণ (আমার মা মাখতেন) আর ছিল চেশমী গ্লিসারীনের গন্ধ মাখানো।বড়দিনে সান্তাদাদুর উপহার থেকে কেন যে ব্রাত্য ছিলাম তা বুঝতে বুঝতে বয়স আর ছেলেবেলার আঙিনায় রইল না। শীতের ছুটিতে আরো ছিল হাতেগোনা কিছু আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর আনন্দ, ছিল রোদে বসে মায়ের সাথে বড়ি দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা,সেই বড়ির বাটা ডাল থেকে খানিক সরিয়ে রেখে,তাতে কালোজিরে, নুন আর কাঁচা লঙ্কা কুচি দিয়ে ফেটিয়ে মায়ের কাছে বড়া খেতে চাওয়ার বায়না ছিল must, এছাড়াও ফুলকপির সিঙাড়া,কড়াইশুটির কচুরি,ভেজিটেবল চপ,গাজরের হালুয়াসহ আরো নানা পদ আর মায়ের হাতে গ্যাস বা স্টোভ ওভেনে বানানো কেক,আহা !!!
আমাদের পাড়ার পরিবেশ খুব সুবিধাজনক ছিল না।তাই পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর চল ছিল না,শুধুমাত্র দুটো বাড়ির ব্যবধানে বান্ধবী সংযুক্তার বাড়ি আর আমার নিজের বেড়ানোর জন্য ছাদই ভরসা ছিল। ছাদে গিয়ে কল্পনার বন্ধ দরজাটা খুলে দিতাম।পথচারীদের হাঁটা চলা দেখতাম। কখনও কোন স্বল্প পরিচিত, অতি পরিচিত জনের দেখা পেতাম।কখনো ডেকে কথা,কখনো শুধুই দেখা... এ ভাবেই কাটত দিন । তবে শীতে ছাদের মজা সকালে আর দুপুরে।গরমে ছাদের মজা বিকেলে রোদ পড়ে যাওয়ার পরে । কাজেই শীতের বিকেলে খুব একটা ছাদ বিলাসী হতাম না।মায়ের পো ধরে বড়ি বিলাস চলত সকাল সকাল।তার ঠিক আগে ছাদ ঝাঁট ও ধোয়ার পর্ব সম্পন্ন করে দিত আমাদের সরস্বতী দি,মায়ের helping hand ।
মায়ের মতন হতো না,আমার দেওয়া বড়ি,অল্প একটু ডাল বাটা,বাটিতে দিয়ে,মা বলতেন.. "দে গে যা , বিরক্ত করিস না।" আমার বড়ির নাক হতো না,হলেও চ্যাপটা।মায়ের দেওয়া বড়ির টিকলো নাক হতো ,মা বলতেন... "বড়ির নাক টিকলো হলে জামাই এর নাক ভাল হয়,তোর জামাই চিনা ম্যান হবে "। মা মুচকি হাসতেন।আমি ভয়ানক রেগে নাক মানে বড়ির নাক ধরে অনেক টানাটানি করেও নাকের মান বাড়াতে পারতাম না।এক সময় বাটির ডাল বাটা শেষ হোতো।বলতে নেই,মায়ের জামাই এর নাক খান খাড়ার মতন।আর এখন মা আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে,তবুও মাকে বলতে ইচ্ছে করে,তোমার নাত-জামাই এর নাক মন্দ হওয়া উচিত নয়,তোমার বড়ি তত্ত্ব অনুযায়ী।আমার দেওয়া বড়ির নাক সময়ের হাত ধরে মায়ের হাতের তৈরি বড়ির মতনই টিকলো হয়েছে, কিন্তু আমার কন্যার পছন্দ জুড়ে মঙ্গোলীয় গায়কদের (BTS)দাপটে আমি বেশ সন্দিগ্ধ এই ব্যাপারে !!!!কন্যা আমার,নাক চ্যাপটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে... দেখলেই গদোগদো।পাড়াতে নতুন আসা এক মণিপুরী পরিবারের মা আর ছা দুজনের সাথেই তার আলাপচারিতা শুরু হয়ে গেছে।
শীতে এক ছাদ রোদে মাদুর পেতে বালিশ,লেপ Sun Bath নিতো। নিত্য দিনের কাজে,শীতকালে,এ ছিল আমার এক আনন্দের কাজ।লেপ,বালিশ ঘাড়ে করে ছাদের রোদবিলাসী হওয়া।একবারে যাওয়ার উপায় নেই। তাই যাতায়াত চলত বার দুই তিনেক।তোশক রোজ দিতাম না,বলা ভাল পারতাম না ,শক্তিতে কুলোতো না।লেপ গুলো ঝুলে পড়ত ছাদের আলসেতে।মাঝে মধ্যে ওই সুবাদে ছাদ ভ্রমণ চলত।লেপ , বালিশ এপিঠ ওপিঠ করে রোদ খাওয়ানোর চল ছিল।ওই কাজে আমার ছিল ভয়ানক উৎসাহ ,কাজের অছিলায় পড়া থেকে ক্ষণিকের ছুটি মিলত।তবে দুপুরে খাওয়ার পর যখন মা পানের খিলি মুখে পুরতেন,ওমনি গরম গরম বিছানা হাজির করতাম মায়ের সামনে আর মায়ের মুখে খুশির ঝিলিক দেখতে পেতাম।মনে হতো যেন রাজ্যলাভ করেছি। এরপরেই খবরের কাগজ নিয়ে মা লেপের আশ্রয়ে হাজির হতেন আর আমিও গল্পের বই নিয়ে লেপের ওম নিতে নিতে এক সময় ঘুমের দেশে চলে যেতাম। শীতের ছুটি জমে উঠতো।
শীতের আরেক গল্প জয়নগরের মোয়া,পিঠে পুলির হৈচৈ পৌষ সংক্রান্তীতে।মা করতেন দুধ পুলি,পাটিসাপটা,নতুন গুড়ের পায়েস,সরা পিঠে। এগুলোর সব আমার খুব পছন্দের নয় ,এক নতুন গুড়ের পায়েস ,পাটিসাপটা আর পাটালি দিয়ে দুধ ভাত।আহা!!!
আমাদের বাড়ির বাজার সরকার ছিল সরস্বতীদি,তবে বাজার করে তার কিঞ্চিত আয় হতো,তার প্রভাবে শীতকালীন তরতাজা ও মনোলোভন সব্জীর ঠাঁই হতো না আমাদের বাড়িতে।সে বাজার থেকে মলিনতা মাখানো সব্জী আনতো টাটকা সব্জীর দামে,তাতেই তার কিঞ্চিত আয় হোতো।পরে স্কুলজীবনের শেষবেলায় আমরা কসবা নিবাসী হলাম, তখন বাজারের হাতেখড়ির সময়ে শীতকালীন সব্জীর রঙবেরঙের বাহার দেখে সেই যে মুগ্ধ হলাম,আজও শীতকালীন সব্জী সেই মুগ্ধতা নিয়েই প্রতি শীতে আমার কাছে হাজির হয়।শীতের বাজার ঠাসা মরশুমি ফল,সব্জীর জুড়ি মেলা ভার।পুরো লাল,নীল,সবুজের মেলা বসা বাজার। আমলকি,কমলালেবু,আপেল ইত্যাদি মরশুমি ফলের সাথে সাথে কতশত শীতকালিন সব্জী ভাবো একবার!!!! এখন সারাবছর সব সব্জি পাওয়া গেলেও,সময় মতনই তার স্বাদ খোলতাই হয়।
শীতের সব্জী বাহারে গোড়ার দিকে যতোই ফুলকপি,টমেটো আর বাধা ধরা বাধাকপিকে রাখো না কেন শীতের বাজারের মম করা গন্ধযুক্ত ধনেপাতাকে ভুললে কি চলে??ব্যাসনে চুবিয়ে বড়া করো,নয়তো হালকা হাতে কোন কোন রান্নার ওপরে বা স্যালাডের ওপরে ছড়িয়ে দিলে তা যে কত সুন্দর হয় তাতে কোন সন্দেহই নেই।রয়েছে লাউ,যা সারা বছর থাকলেও,এই সময়ে বিউলির ডালের বড়ি আর ধনেপাতা সহযোগের ঘন্ট পাকিয়ে,একটা দারুণ ব্যাপার তৈরি করে যার কোন তুলনাই হয় না।রয়েছে পালং শাক,মূলো শাক,মেথি শাক,লাল শাকের এলাহী আয়োজন।পালংশাকের খান কতক পদের মধ্যে পালং পনীর অনেকে,যারা আদপেই শাকপ্রেমী নন,তাদের রসনার তৃপ্তি দানকারী।মেথি শাকের গতে বাঁধা পদ ছাড়াও পরোটাও আছে। শীতের বেগুনের ভাজা খাও,পোড়া খাও,ভাপা খাও,ভর্তা খাও,মৎসপ্রিয় বাঙালির কালোজিরে,কাঁচালঙ্কা ও বিউলির ডালের বড়ির ঝোলে বেগুন আলু দিয়ে খাও,সাদা জিরের মাছের ঝোলে বেগুন দিয়ে খাও,অপূর্ব লাগে কিনা বলো দেখি!!!!শীতকালীন সব্জী মিলিয়ে জুলিয়ে যেমন তৈরি হয় অসাধারণ পাঁচমিশালী,তেমনই নানান সব্জি দিয়ে তৈরি মুগ ডাল এই সময়ের আরেক দারুণ রকমের খাবারের আয়োজন। নানান শীতকালীন সব্জী সমন্নিত খিঁচুড়ি শীতের আরেক অন্যতম আকর্ষণ।যা আবার সরস্বতী পূজোর ভোগরূপে আমাদের স্কুলবেলার মতন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রসিয়ে ও কষিয়ে রাঁধা বীট গাজরের আমিষ ও নিরামীষ তরকারির স্বাদ পুরো একঘর।মাছের মাথা দিয়ে জম্পেস করে বাধাকপির স্বাদ কি ভোলা যায়? মায়ের হাতের ফুলকপির কোর্মা,রোস্টের কথা ভুলতে পারি না ।শীতের সর্ব্জীকে নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।কাজেই সবার কথা লেখা গেল না।তবে আমার সব্জী প্রীতির মূলে রয়েছেন আমার মা।যদিও সব্জীর প্রতি কোনকালেই খুব একটা অনীহা আমার ছিল না।মায়ের হাতের রান্না কার না ভাল লাগে? যদিও আমার মায়ের রান্নার আদর কদর ছিল আমার বন্ধু মহলে।তাতে গরম কালীন সব্জী গণও ব্রাত্য হয়নি।সে গল্প আবার হবে কখনো,কোনোদিন।তবে শীতের বাজার যে শুধুই নিরামিষাসী তা কিন্তু নয়,শীতের পারশে,পুটি,মৌরলার স্বাদের সত্যিই কোন ভাগ হবে না।ইলিশ যেমন বর্ষাকালে বাঙালির রসনাকে ভরিয়ে তোলে এরা আমাদের শীতকালীন রান্নাঘরের শোভা বর্ধন করে।
আমাদের মা মেয়ের জীবনে শীতকাল অনেক গল্প লিখেছে।স্কুলের দীর্ঘ পূজোর ছুটির পর যখন শীতকাল তার পদচারণা করত তখন সন্ধ্যা নামার সময় থেকে এক পাগল করা সুবাস ছড়িয়ে পড়ত চারি ধারে,সকালের ব্যস্ততায় হয়তো বা তা চাপা পড়ে যেতো। অথবা কেয়াফুলের ওমন সুবাসকে চাপা দিতেন সূজ্জি মামা।কে জানে? আজও শীতের সন্ধ্যায় কেয়া ফুলের গন্ধ মাতাল করে তোলে আমাদের।তবে আগেকার মতন চরাচর ব্যপী কুয়াশা মোড়া ভোর দেখি না।আগের মতন জমাটি শীতও পড়ে না।
শীতে মায়ের এক শৌখিন অভ্যাস ছিল।অনেক সখ শৌখিনতা যদিও নানান কারণজন্য সরিয়ে দিয়েছিলেন,কিন্তু শীত কালে ধূমায়িত কড়া এক কাপ কফি ছিল মায়ের ভালবাসা।কফির কড়া মেজাজ,কড়া গন্ধ যা আমার কোনদিনই পছন্দসই নয়,তা ছিল মায়ের ভয়ানক প্রিয়।আর মায়ের টিকলো নাক ধারী জামাতাটিও কফি বলতে অজ্ঞান!!! আমার বান্ধবী অর্চিতার মতন কফি আমি বাপু পারি না বানাতে !!! সবাই কি সব পারে?? এ এক হক কথা।আমার আরেক বান্ধবী মৌ এর তো কফির দেশেই বিয়ে,তাই তার কফিও ফাস্ট ক্লাস।আমি বাপু সেকেন্ড ক্লাসেই নিজেকে ধরি রেখেছি।চুপিচুপি বলি, যা নিজে খাই না,তা ভাই যত্ন নিয়ে শিখিও না🙏🏻🤫।
শীত আমার কাছে সব সময়ই বড্ড প্রিয়।শীতের আবহাওয়া খাবারের হজমের পক্ষেও বেশ ভাল ।এই সময়ে অনেক অনেক কাজেও শরীরের ক্লান্তি আসে কম।গরমে আমি মায়ের মতনই বড় কাহিল।তাই গরমকাল আমার Good Book এ নেইকো।প্রতিটি ঘটনা যে কার্য কারণ সম্পর্কে আবদ্ধ তা সকলেরই জানা আর দর্শন পড়ার সুবাদে আমি পুঁথিগতভাবেও তা জানিও বটে ,মানিও বটে। গরমকালে নানান রকমের শারীরিক কষ্ট ভোগ করে মায়ের মতন আমিও গরমকালে থাকি গরম মেজাজ নিয়ে,গরমকাল নিয়ে তাই আবেগ প্রবণ নই।অন্য দিকে শীতে যাদের শারীরিক কষ্ট হয় লাগামছাড়া,তাদের পক্ষে শীতকালের গুণকীর্তন করা অসম্ভব।
ওই সময়ের শীতের চড়ুইভাতির অভিজ্ঞতা আমার খুব কম।সংযুক্তা কখনও কখনও ওর সাথে নিয়ে গিয়েছে পিকনিকে । মজাও হয়েছে । বইমেলা ছাড়া আর অন্য কোনো শীতকালীন মেলায় মা নিয়ে যেতেন না। এ ভাবেই দিন গুলো পেরিয়ে এসে,ফিরে দেখতে ভাল লাগে এখন।আগের দিন ছিল তখনকার মতন ভালো,এখনকার দিন এখনকার মতন সুন্দর। এ ভাবেই যা আজ তা কাল হবে অতীত। তাই না???
No comments:
Post a Comment