কন্যার হিজিবিজি শিল্প কর্মের জন্য পুরাতন ডাইরীর খোঁজ করছিলাম ... এক সময় ডাইরির খোঁজ করতেন আমার মা , আমার জন্য। মন খুলে কথা বলার বদলে কথার পিঠে কথা সাজিয়ে কথার মালা গাঁথার অভ্যাস আমার বেশ প্রাচীন । পুপে দেবী অবশ্যি লেখেন না , উনি আঁকার চেষ্টা করে থাকেন , সেখানে তার কথার মতন পাকামো এখনো আসেনি , নেহাতই চলনসই অঙ্কন । তবে মন্দও বলা যায় না সব গুলোকে । হাল ধরে না থাকলে কোন দিকে তার শিল্প ভাসমান হবে , বলা ভারি মুশকিল। তবে কথা হল গিয়ে .... ডাইরি খোঁজ করতে গিয়ে পুরাতন ডাইরির ভাঁজে , আমার আরেক পছন্দসই বিষয়ের দেখা মিলল .... এখনকার প্রজন্মের কাছে হয়তো অ্যান্টিক বস্তু হবেও বা .... post card ।
স্মৃতির পদচারণা শুরু হল .... বছরের অন্যতম বিশেষ সময় বিজয়া .... মা দুর্গার কৈলাশে ফেরার পর শুরু হয় এই পর্ব । আগে থেকেই মা , আনিয়ে রাখতেন post card আর inland .... দূর দূরান্তে থাকা আত্মীয় , বন্ধুর বাড়িতে বিজয়ার প্রণাম ও শুভ কামনার বিনিময় হতো , এর হাত ধরে । ছোটবেলায় , মায়ের পাশে বসে দেখতাম । আর একটু বয়স বাড়ার পরে , ঠিকানা লেখার দায়িত্ব বর্তালো আমার ওপর , গর্বিত আমি , তাতে ভারি আনন্দ পেতাম ... আমার লেখা ঠিকানা মাইলের পর মাইল পেরিয়ে নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছবে !!! এ কি কম কথা !!! সময়ের হাত ধরে এক সময় , বিজয়ার চিঠি লেখার দায়িত্ব পুরোটাই আমার ওপর বর্তালো । সমান ভাল লাগা নিয়েই তা সম্পন্ন করতাম । এখন ওই প্রথা বিলুপ্ত সময়ের দাবী মেনে , অবশ্যই খারাপ লাগে 😞
স্কুলের সময়ে চিঠি বিনিময়ের নানা রকম রোমান্টিক সুযোগ থাকে , যা থেকে পুরোপুরিই বঞ্চিত ছিলাম বলা যায় না , কারণ , কি ভাবে যেন বান্ধবী রুমা জেনে গিয়েছিল , আমাকে দিয়ে চিঠি লেখানো যেতে পারে ... তাই আমার বয়ানে রুমার মন কেমনের চিঠির লেখিকা ছিলাম আমি , বলা ভালো লেখার প্রধান উপদেষ্টা আমি , সাথে দুই সহকারী শুভদ্রা আর চন্দ্রাণী 🙃😊।
স্কুলে আমার আর এষার মধ্যে অনেক চিঠির আদান-প্রদান হতো , যে সব কথা ক্লাসের মধ্যে বলার সুযোগ হতো না ... সে সবের কিছু কিছু আজও খোঁজ করলে পাওয়া যেতে পারে । এষা দারুণ চিঠি লিখতো । ডাক মারফত চিঠি নয় , নেহাতই হাতে হাতে আদান-প্রদানের দ্রুত গতি সম্পন্ন চিঠি ।
এরপর যাদবপুরে ছিল শর্মি । ওর লেখা চিঠিও দারুণ লাগত পড়তে , তখন অল্প স্বল্প গল্প লিখে ডাইরি ভরাতে শুরু করেছি । শর্মি , শম্পা , মৌমিতা আর কৌশিকী ছিল আমার একনিষ্ঠ পাঠিকা । তবে ওরা চিঠিতে ছিল না , চিঠিতে একমাত্র ছিল শর্মি । পরে নতুন সংসার পাতল সুদূর কেন্টাকিতে , ওখান থেকে একবারই চিঠি পাঠিয়েছিল । তখন আস্তে ধীরে চিঠি তার পাট গোটাচ্ছে 😞 !!!
এরপরের পর্বে আমি এলাম নতুন সংসারে , নাহ্ , তেনার চিঠি লেখার কোন বাই নেই😭 । বিয়ের আগের চিঠি যদি প্রেম পত্তর হয় , তবে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর , আলাপ চারিতা যখন মধ্যগগনে এবং আমি ক্লীন বোল্ড, হেনকালে চিঠি লিখলাম ... " কি লিখি তোমায় " ...এই লাইন লিখে শুরু করলাম...পাতা জোড়া কাব্য। উত্তর এলো পুরো গদ্য তে 🙄। প্রথম লেখা চিঠির পাতা হল ওষুধ কোম্পানির দেওয়া চিরকূট। যে চিরকূটে এখন সাংসারিক গদ্য লেখা হয় , যেমন বাজারের ফর্দ , মুদির দোকানের অল্প কিছু উপকরণ ইত্যাদি ।
শর্মি আর আমি কলেজে এই দুঃখ গলা জড়িয়ে অনেক সময়েই করতাম .. আমরা চিঠি ভাল লিখলে কি হবে রে !! পড়ার লোক নেই কো !!!😔
বিয়ের পর নতুন জীবন শুরু হল ... তিনি হোস্টেলে , আমি নতুন পরিজনদের চেনাজানার মহরতে , অর্থাৎ শ্বশুরবাড়িতে । সপ্তাহান্তে শনিবারের দিকে চেয়ে থাকি , মাঝে মাঝে special visit এর চমক , শুধুই রাতের অতিথি , সকালেই হোস্টেল গামী . . সারা সপ্তাহের রাগ-অনুরাগের দিনলিপি নাকি চিঠি সোমবার সকালে সকলের অলক্ষ্যে রেখে দিতাম তেনার ওয়ালেটে ... হোস্টেল রুমে পাঠ হতো , কিন্তু মিলতো না উত্তর । বেড়ানোর সময় ট্রেনের আপার বার্তে বসে চলত ও তরফের উত্তর লেখার ধূম ... অবশ্যই চিরকূটে 😊😊😊😊। এ ভাবেই কবে যেন চিঠি রা হারিয়ে গেল .... রয়ে গেল শুধুই কি আমার মনের গহনে ??? কে জানে ???
No comments:
Post a Comment