Saturday, 6 December 2025

শীতের গপ্পো

 শীতের এখন তখন


কদিন বেশ জম্পেশ করে শীত পড়েছে।ছুটির ওপর আপাতত ফুলস্টপ।আবার ছুটির আমেজ এ মাসের শেষে,তবে সবটাই পরিস্থিতির অধীন।ঘরে ঘরে এখন ঘোরতর জ্বরো জ্বরো রব।হাঁচি কাশির দখলে গোটা শহর।কোনটা সাধারণ আর কোনটা অসাধারণ  কে জানে?ওসব বিপদের কথা থাক আপাতত।   হঠাৎই মুঠোফোনের আঙিনায় আমার কলেজের বান্ধবী মনীষার একখান মন ছোঁয়া লেখা পড়ে ভারি স্মৃতি মেদুর হয়ে পড়লাম।বিষয়....আমাদের ছোটবেলার বড়দিন ও শীতের ছুটি.. ।

ভাবলাম, আমার নিজস্ব স্মৃতির ঝাঁপিতে একটু উঁকি মারলে কেমন হয় ??ওই লেখাটার অনেকখানিই যেন চেনা চেনা গন্ধ মাখা।তবে কিছু তো অচেনা হবেই।যেমন পূজোর প্যাণ্ডলে সবাই দশভূজার আরাধনা করেন একই আঙ্গিকে, কিন্তু প্রতিটি পূজোর ধরণধারণ স্বতন্ত্র। এও তাই।আমাদের সময়টা একই, কিন্তু কিছু কিছু ভিন্নতা পরিবেশের হাত ধরে রয়েছে,যেখানে আমাদের কারো হাত নেই। 

আমাদের ছোটকালে শীতের ছুটি একই রকম ভাবে উপহার বিহীন বড়দিন,তুহিনা লোশন্, পণ্ডস্ কোল্ড ক্রিম, শিশি বন্দী গ্লিসারীণ (আমার মা মাখতেন) আর ছিল চেশমী গ্লিসারীনের গন্ধ মাখানো।বড়দিনে সান্তাদাদুর উপহার থেকে কেন যে ব্রাত্য ছিলাম তা বুঝতে বুঝতে বয়স আর ছেলেবেলার আঙিনায় রইল না। শীতের ছুটিতে আরো ছিল হাতেগোনা কিছু আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর আনন্দ, ছিল রোদে বসে মায়ের সাথে বড়ি দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা,সেই বড়ির বাটা ডাল থেকে খানিক সরিয়ে রেখে,তাতে কালোজিরে, নুন আর কাঁচা লঙ্কা কুচি দিয়ে ফেটিয়ে মায়ের কাছে বড়া খেতে চাওয়ার বায়না ছিল must, এছাড়াও ফুলকপির সিঙাড়া,কড়াইশুটির কচুরি,ভেজিটেবল চপ,গাজরের হালুয়াসহ আরো নানা পদ আর মায়ের হাতে গ্যাস বা স্টোভ ওভেনে বানানো কেক,আহা !!! 

আমাদের পাড়ার পরিবেশ খুব সুবিধাজনক ছিল না।তাই পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর চল ছিল না,শুধুমাত্র দুটো বাড়ির ব্যবধানে বান্ধবী সংযুক্তার বাড়ি আর আমার নিজের বেড়ানোর জন্য ছাদই ভরসা ছিল। ছাদে গিয়ে কল্পনার বন্ধ দরজাটা খুলে দিতাম।পথচারীদের হাঁটা চলা দেখতাম। কখনও কোন স্বল্প পরিচিত, অতি পরিচিত জনের দেখা পেতাম।কখনো ডেকে কথা,কখনো শুধুই দেখা... এ ভাবেই কাটত দিন । তবে শীতে ছাদের মজা সকালে আর দুপুরে।গরমে ছাদের মজা বিকেলে রোদ পড়ে যাওয়ার পরে । কাজেই শীতের বিকেলে খুব একটা ছাদ বিলাসী হতাম না।মায়ের পো ধরে বড়ি বিলাস চলত সকাল সকাল।তার ঠিক আগে ছাদ ঝাঁট ও ধোয়ার পর্ব সম্পন্ন করে দিত আমাদের সরস্বতী দি,মায়ের helping hand ।

মায়ের মতন হতো না,আমার দেওয়া বড়ি,অল্প একটু ডাল বাটা,বাটিতে দিয়ে,মা বলতেন.. "দে গে যা , বিরক্ত করিস না।" আমার বড়ির নাক হতো না,হলেও চ্যাপটা।মায়ের দেওয়া বড়ির টিকলো নাক হতো ,মা বলতেন... "বড়ির নাক টিকলো হলে জামাই এর নাক ভাল হয়,তোর জামাই চিনা ম্যান হবে "। মা মুচকি হাসতেন।আমি ভয়ানক রেগে নাক মানে বড়ির নাক ধরে অনেক টানাটানি করেও নাকের মান বাড়াতে পারতাম না।এক সময় বাটির ডাল বাটা শেষ হোতো।বলতে নেই,মায়ের জামাই এর নাক খান খাড়ার মতন।আর এখন মা আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে,তবুও মাকে বলতে ইচ্ছে করে,তোমার নাত-জামাই এর নাক মন্দ হওয়া উচিত নয়,তোমার বড়ি তত্ত্ব অনুযায়ী।আমার দেওয়া বড়ির নাক সময়ের হাত ধরে মায়ের হাতের তৈরি বড়ির মতনই টিকলো হয়েছে, কিন্তু আমার কন্যার পছন্দ জুড়ে মঙ্গোলীয় গায়কদের (BTS)দাপটে আমি বেশ সন্দিগ্ধ এই ব্যাপারে !!!!কন্যা আমার,নাক চ্যাপটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে... দেখলেই গদোগদো।পাড়াতে নতুন আসা এক মণিপুরী পরিবারের মা আর ছা দুজনের সাথেই তার আলাপচারিতা শুরু হয়ে গেছে। 

শীতে এক ছাদ রোদে মাদুর পেতে বালিশ,লেপ Sun Bath নিতো। নিত্য দিনের কাজে,শীতকালে,এ ছিল আমার এক আনন্দের কাজ।লেপ,বালিশ ঘাড়ে করে ছাদের রোদবিলাসী হওয়া।একবারে যাওয়ার উপায় নেই। তাই যাতায়াত চলত বার দুই তিনেক।তোশক রোজ দিতাম না,বলা ভাল পারতাম না ,শক্তিতে কুলোতো না।লেপ গুলো ঝুলে পড়ত ছাদের আলসেতে।মাঝে মধ্যে ওই সুবাদে ছাদ ভ্রমণ চলত।লেপ , বালিশ এপিঠ ওপিঠ করে রোদ খাওয়ানোর চল ছিল।ওই কাজে আমার ছিল ভয়ানক উৎসাহ ,কাজের অছিলায় পড়া থেকে ক্ষণিকের ছুটি মিলত।তবে দুপুরে খাওয়ার পর যখন মা পানের খিলি মুখে পুরতেন,ওমনি গরম গরম বিছানা হাজির করতাম মায়ের সামনে আর মায়ের মুখে খুশির ঝিলিক দেখতে পেতাম।মনে হতো  যেন রাজ্যলাভ করেছি। এরপরেই খবরের কাগজ নিয়ে মা লেপের আশ্রয়ে হাজির হতেন আর আমিও গল্পের বই নিয়ে লেপের ওম নিতে নিতে এক সময় ঘুমের দেশে চলে যেতাম। শীতের ছুটি জমে উঠতো।

শীতের আরেক গল্প জয়নগরের মোয়া,পিঠে পুলির হৈচৈ পৌষ সংক্রান্তীতে।মা করতেন দুধ পুলি,পাটিসাপটা,নতুন গুড়ের পায়েস,সরা পিঠে। এগুলোর সব আমার খুব পছন্দের নয় ,এক নতুন গুড়ের পায়েস ,পাটিসাপটা আর পাটালি দিয়ে দুধ ভাত।আহা!!!

আমাদের বাড়ির বাজার সরকার ছিল সরস্বতীদি,তবে বাজার করে তার কিঞ্চিত আয় হতো,তার প্রভাবে শীতকালীন তরতাজা ও মনোলোভন সব্জীর ঠাঁই হতো না আমাদের বাড়িতে।সে বাজার থেকে মলিনতা মাখানো সব্জী আনতো টাটকা সব্জীর দামে,তাতেই তার কিঞ্চিত আয় হোতো।পরে স্কুলজীবনের শেষবেলায়  আমরা কসবা নিবাসী হলাম, তখন বাজারের হাতেখড়ির সময়ে শীতকালীন সব্জীর রঙবেরঙের বাহার দেখে সেই যে  মুগ্ধ হলাম,আজও শীতকালীন সব্জী সেই মুগ্ধতা নিয়েই প্রতি শীতে আমার কাছে  হাজির হয়।শীতের বাজার ঠাসা মরশুমি ফল,সব্জীর জুড়ি মেলা ভার।পুরো লাল,নীল,সবুজের মেলা বসা বাজার। আমলকি,কমলালেবু,আপেল ইত্যাদি মরশুমি ফলের সাথে সাথে কতশত শীতকালিন সব্জী ভাবো একবার!!!! এখন সারাবছর সব সব্জি পাওয়া গেলেও,সময় মতনই তার স্বাদ খোলতাই হয়।

শীতের সব্জী বাহারে গোড়ার দিকে যতোই ফুলকপি,টমেটো আর বাধা ধরা বাধাকপিকে রাখো না কেন শীতের বাজারের মম করা গন্ধযুক্ত ধনেপাতাকে ভুললে কি চলে??ব্যাসনে চুবিয়ে বড়া করো,নয়তো হালকা হাতে কোন কোন রান্নার ওপরে বা স্যালাডের ওপরে ছড়িয়ে দিলে তা যে কত সুন্দর হয় তাতে কোন সন্দেহই নেই।রয়েছে লাউ,যা সারা বছর থাকলেও,এই সময়ে বিউলির ডালের বড়ি আর ধনেপাতা সহযোগের  ঘন্ট পাকিয়ে,একটা দারুণ ব্যাপার তৈরি করে যার কোন তুলনাই হয় না।রয়েছে পালং শাক,মূলো শাক,মেথি শাক,লাল শাকের এলাহী আয়োজন।পালংশাকের খান কতক পদের মধ্যে পালং পনীর অনেকে,যারা আদপেই শাকপ্রেমী নন,তাদের রসনার তৃপ্তি দানকারী।মেথি শাকের গতে বাঁধা পদ ছাড়াও পরোটাও আছে। শীতের বেগুনের ভাজা খাও,পোড়া খাও,ভাপা খাও,ভর্তা খাও,মৎসপ্রিয় বাঙালির কালোজিরে,কাঁচালঙ্কা ও বিউলির ডালের বড়ির ঝোলে বেগুন আলু দিয়ে খাও,সাদা জিরের মাছের ঝোলে বেগুন দিয়ে খাও,অপূর্ব লাগে কিনা বলো দেখি!!!!শীতকালীন সব্জী মিলিয়ে জুলিয়ে যেমন তৈরি হয় অসাধারণ পাঁচমিশালী,তেমনই নানান সব্জি দিয়ে তৈরি মুগ ডাল এই সময়ের আরেক দারুণ  রকমের খাবারের আয়োজন। নানান শীতকালীন সব্জী সমন্নিত খিঁচুড়ি শীতের আরেক অন্যতম আকর্ষণ।যা আবার সরস্বতী পূজোর ভোগরূপে আমাদের স্কুলবেলার মতন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। রসিয়ে ও কষিয়ে রাঁধা বীট গাজরের আমিষ ও নিরামীষ তরকারির স্বাদ পুরো একঘর।মাছের মাথা দিয়ে জম্পেস করে বাধাকপির স্বাদ কি ভোলা যায়? মায়ের হাতের ফুলকপির কোর্মা,রোস্টের কথা ভুলতে পারি না ।শীতের সর্ব্জীকে নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।কাজেই সবার কথা লেখা গেল না।তবে আমার সব্জী প্রীতির মূলে রয়েছেন আমার মা।যদিও সব্জীর প্রতি কোনকালেই খুব একটা অনীহা আমার ছিল না।মায়ের হাতের রান্না কার না ভাল লাগে? যদিও আমার মায়ের রান্নার আদর কদর ছিল আমার বন্ধু মহলে।তাতে গরম কালীন সব্জী গণও ব্রাত্য হয়নি।সে গল্প আবার হবে কখনো,কোনোদিন।তবে শীতের বাজার যে শুধুই নিরামিষাসী তা কিন্তু নয়,শীতের পারশে,পুটি,মৌরলার স্বাদের সত্যিই কোন ভাগ হবে না।ইলিশ যেমন বর্ষাকালে বাঙালির রসনাকে ভরিয়ে তোলে এরা আমাদের শীতকালীন রান্নাঘরের শোভা বর্ধন করে।

 আমাদের মা মেয়ের জীবনে শীতকাল অনেক গল্প লিখেছে।স্কুলের দীর্ঘ পূজোর ছুটির পর যখন শীতকাল তার পদচারণা করত তখন সন্ধ্যা নামার সময় থেকে এক পাগল করা সুবাস ছড়িয়ে পড়ত চারি ধারে,সকালের ব্যস্ততায় হয়তো বা তা চাপা পড়ে যেতো। অথবা কেয়াফুলের ওমন সুবাসকে চাপা দিতেন সূজ্জি মামা।কে জানে? আজও শীতের সন্ধ্যায় কেয়া ফুলের গন্ধ মাতাল করে তোলে আমাদের।তবে আগেকার মতন চরাচর ব্যপী কুয়াশা মোড়া ভোর দেখি না।আগের মতন জমাটি শীতও পড়ে না।   

শীতে মায়ের এক শৌখিন অভ্যাস ছিল।অনেক সখ শৌখিনতা যদিও নানান কারণজন্য সরিয়ে দিয়েছিলেন,কিন্তু শীত কালে ধূমায়িত কড়া এক কাপ কফি ছিল মায়ের ভালবাসা।কফির কড়া মেজাজ,কড়া গন্ধ যা আমার কোনদিনই পছন্দসই নয়,তা ছিল মায়ের ভয়ানক প্রিয়।আর মায়ের টিকলো নাক ধারী জামাতাটিও কফি বলতে অজ্ঞান!!! আমার বান্ধবী অর্চিতার মতন কফি আমি বাপু পারি না বানাতে !!! সবাই কি সব পারে?? এ এক হক কথা।আমার আরেক বান্ধবী মৌ এর তো কফির দেশেই বিয়ে,তাই তার কফিও ফাস্ট ক্লাস।আমি বাপু সেকেন্ড ক্লাসেই নিজেকে ধরি রেখেছি।চুপিচুপি বলি, যা নিজে খাই না,তা ভাই যত্ন নিয়ে শিখিও না🙏🏻🤫।

শীত আমার কাছে সব সময়ই বড্ড প্রিয়।শীতের আবহাওয়া খাবারের হজমের পক্ষেও বেশ ভাল ।এই সময়ে অনেক অনেক কাজেও শরীরের ক্লান্তি আসে কম।গরমে আমি মায়ের মতনই বড় কাহিল।তাই গরমকাল আমার Good Book এ নেইকো।প্রতিটি ঘটনা যে কার্য কারণ সম্পর্কে আবদ্ধ তা সকলেরই জানা আর দর্শন পড়ার সুবাদে আমি পুঁথিগতভাবেও তা জানিও বটে ,মানিও বটে। গরমকালে নানান রকমের  শারীরিক কষ্ট ভোগ করে মায়ের মতন আমিও গরমকালে থাকি গরম মেজাজ নিয়ে,গরমকাল নিয়ে তাই আবেগ প্রবণ নই।অন্য দিকে শীতে যাদের শারীরিক কষ্ট হয় লাগামছাড়া,তাদের পক্ষে শীতকালের গুণকীর্তন করা অসম্ভব। 

ওই সময়ের শীতের চড়ুইভাতির অভিজ্ঞতা আমার খুব কম।সংযুক্তা কখনও কখনও ওর সাথে নিয়ে গিয়েছে পিকনিকে । মজাও হয়েছে । বইমেলা ছাড়া আর অন্য কোনো শীতকালীন মেলায় মা নিয়ে যেতেন না। এ ভাবেই দিন গুলো পেরিয়ে এসে,ফিরে দেখতে ভাল লাগে এখন।আগের দিন ছিল তখনকার মতন ভালো,এখনকার দিন এখনকার মতন সুন্দর। এ ভাবেই যা আজ তা কাল হবে অতীত। তাই না???

Tuesday, 18 November 2025

হঠাৎ করে হলদিয়া

 আমরা হঠাৎ করে একদিনের জন্য হলদিয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, এই মাসের প্রথম সপ্তাহে। একদিনের জন্য মন্দ না। আমরা কলকাতা থেকে দুই পরিবার একটা গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম। বাড়ি থেকে অল্প জলখাবার খেয়ে প্রায় সকাল ১০.৩০ নাগাৎ র‌ওনা দিলাম। বেলা ১২ নাগাৎ কোলাঘাট এর শের -এ -পাঞ্জাব ধাবায় চা এবং টা পান বিরতির পর আরও ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে আমরা সরকারি guest house হলদিয়া আবাসনে পৌঁছলাম। 

Guest house এর সামনের রাস্তা পেরিয়ে রাস্তা গেছে নদীর দিকে বেঁকে। Guest house এর ভিতর শীতের মরসুমী ফুলের বাগান দেখার মতো। উল্টো দিকে নদীতে একটা বিদেশী জাহাজ নোঙর করা ছিল। কাছেই জেটিতে চলছিল মাল নামানোর কাজ। জাহাজ সম্ভবত ছিল Middle East এর। উর্দু হরফে নাম লেখা ছিল জাহাজের গায়ে।

আমরা একটু fresh হয়ে, দুপুরের খাবারখেয়ে সোজা  নদীর ধারে বেড়াতে গেলাম। প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে অন‍্য সব ই বড় মেকি। নদীর ঠান্ডা হাওয়ায় একটু একটু শীত করলেও,  লাগছিল বেশ। ওখানে বসার জন্য সিমেন্ট বাঁধানো বেঞ্চে বসে, ছবি তুলে বেশ খানিকটা সময় কেটে গেল।এরপর গাড়ি নিয়ে আশপাশে একটু ঘুরে , আমরা guest house এ ফিরে এলাম। বারান্দা থেকে নদী, নোঙর করা জাহাজ,আরো চলমান বেশ কিছু জাহাজ ও দেখলাম। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে, সন্ধ্যা বেলায় আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে হলদিয়া র river side বলে পরিচিত সুন্দর ভাবে সাজানো গোছানো একটা জায়গায় গেলাম , শহরের মধ্যে দিয়ে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা, সরকারি আবাসন আমাদের কলকাতার salt lake এর কথা মনে পড়াচ্ছিল। নদীর ধারে হাল্কা আলোয় মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। অল্পক্ষণ ঘুরে, ধূমায়িত চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে, আমরা guesthouse এ ফিরে এলাম। রাতে কুয়াশা র চাদরে guest house. এর বাগান দেখে horror movie তে দেখা দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে ‌উঠছিল। দূর্ভেদ্য কুয়াশা মেখে নোঙর করা জাহাজ ও চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। জাহাজের ভোঁ জানান দিচ্ছিল তার উপস্থিতি।

পরেরদিন জলখাবার খেয়ে , সকলে স্নান করে নিয়ে guesthouse এর বাগানে আর নদীর ধারে অনেকক্ষণ কাটিয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে হলদিয়া থেকে বেরিয়ে পড়লাম , পথে দেখলাম মহিলাদল রাজবাড়ী। রাজবাড়ী আছে বর্তমানে দুই টি। ইতিহাস বলে তিনটি.....যার মধ্যে প্রথমটির কোনো অস্তিত্ব ই নেই। প্রাচীন রাজবাড়িটি প্রায় পরিত‍্য‌ক্ত। তুলনামূলকভাবে নতুন রাজবাড়িটি সুন্দর ভাবে রক্ষিত। সেখানে রাজাদের ব‍্যবহৃত দ্রব‍্য‌াদি,ব‌ই, শিকার করা পশু, পাখি নিয়ে রয়েছে একটি সংগ্রহশালা। রাজবাড়ির বিশাল এলাকার মধ্যে রয়েছে মন্দির, পুকুর, পরিত‍্যক্ত প্রাসাদ। 

রাজবাড়ির বর্তমান সদস‍্যরা কলকাতার বাসিন্দা। তাদের এখানে আসা যাওয়া বজায় আছে নিয়মিত ভাবে ই। এই রাজ পরিবার মুঘল আমলের। অনেক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে,আজ ও তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই রাজপরিবারের ইতিহাস লিপিবদ্ধ রয়েছে নতুন রাজবাড়ির দরবার কক্ষের প্রবেশদ্বারের পাশে।

একদিনের জন্য খুব ই ভাল একটা ‌weekend destination.....

Thursday, 13 November 2025

মুর্শিদাবাদে দু রকম

 আমাদের স্কুল বাস যখন আমাদের সাবালকত্বের দরজায় পৌঁছেই দিল ( বাস সার্ভিস বন্ধ হল ) , তখন আমি স্কুলের পথে এগিয়ে গেলাম বেসরকারি বাসের সহায়তায় । এখানে আমার দুই সঙ্গী ছিল । দেবযানী আমার বান্ধবী আর এক ক্লাসের জুনিয়র সোমা । 

সোমার পাড়াতুত দিদি রিন্তা দির সাথে ওখানেই আলাপ। সোমাদের পাড়ায় ছিল রিন্তাদির মামা বাড়ি । সোমাদের বাড়ি ছিল পশ্চিম পুটিয়ারী আর দেবযানীর বাড়ি পূর্ব পুটিয়ারি ।

তো সেই রিন্তাদি কে বহুবছর পেরিয়ে সামনে পেলাম আমাদের মুর্শিদাবাদগামী ভাগিরথী এক্সপ্রেসের কম্পার্টমেন্টে । মাকে নিয়ে দিদি ফিরছিল জিয়াগঞ্জের কর্মক্ষেত্রে । 

এক শুক্রবার রাতে আমরা মুর্শিদাবাদ পৌঁছলাম। ট্রেনে অনেক প্ল্যান হল একসাথে ঘোরার । শনিবারে নিজের মতন ঘুরব দেবা-দেবী । সকাল থেকে সেই মতোই প্রদীপ মালাকার চলে এল ফূর্তিকে নিয়ে । ফূর্তি হল টাঙ্গার অন্যতম চালিকা মহিলা ঘোড়া । তারপর টগবগিয়ে একে একে সব দেখা হল ... বেলা গড়াল দুপুরে ... তারপর বিকেলে ... সন্ধ্যার সময় ক্লান্ত আমরা ঘরে ফিরলাম। লোকেশনের দিক থেকে হোটেল মঞ্জুশা অসাধারণ !!! সামনে বাগান । বাগান এর পাশ দিয়ে বয়ে চলা ভাগিরথী , নিজস্ব ঘাট ... এক পাশ দিয়ে দৃশ্যমান হাজারদয়ারীর কিয়দংশ। 

রাত ৯ নাগাদ আগমণ রিন্তাদি সহ অসীম দা, সেই দিন প্রথম আলাপ হল দাদার সাথে । অনেক গল্পের পর ঠিক হল ... বাদ বাকি সব দেখা দেখি সকালে মিটিয়ে পরের দিন দুপুরের পর আমরা চলে যাব জিয়াগঞ্জের দিকে ওদের ডেরায় । 

টাঙ্গার জার্নি এতোটাই মনের মতন ছিল ... তাড়াও নেই তেমন ... আমরা ফূর্তির সাথে দুপুরের খাবারের পাট মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জিয়াগঞ্জের উদ্দেশ্যে । ৩টে নাগাদ পৌঁছে দেখি তেনারা দুজনেই ডিউটিরত । আমরা মাসিমার কাছে না গিয়ে , সরাসরি অসীম দার রুমে গেলাম। B.M.O.H ( Block Medical Officer Health ) এর অফিসে বসার সাথে সাথেই একজন এসে বললেন ... " স্যার আছেন ওটিতে , আপনারা আসুন ।" 

সেই প্রথম ওটি প্রবেশ আমার। শহুরে অপারেশন থিয়েটার এর সাথে তফাত বিশাল। তা পরবর্তী কালে পুপের আগমনের সময় বুঝেছিলাম । 

বিশাল এক গড়ের মাঠের মতন হল ঘরের মধ্যেই অসংখ্য বেড , অসংখ্য অপারেশনের রুগী ... অদ্ভুত থমথমে পরিবেশ আর অদ্ভুত এক মিশ্র গন্ধ ( ওষুধ সহ আরো অজানা কিছুর মিশ্রণ ) 

আমার শরীরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থার সূত্রপাতের ছায়া বোধহয় মুখে ফুটে উঠেছিল .... ওটির পোশাকে অসীম দা এগিয়ে এসে , আমাকে দেখেই বলল ... " তোমার বোধহয় কষ্ট হচ্ছে !!! বাইরে আমার ঘরেই বসো , আমি আসছি একটু পরেই। " 

পরে আমরা ওদের কোয়ার্টারেও গেলাম। কিছু পরেই বেরিয়ে পড়লাম সবাই মিলে অসীমদার গাড়িতে .... রাণী ভবানীর চার বাঙলা মন্দির দেখতে , নদী পেরিয়ে। গাড়ি রইল নদীর ওপারে , ব্রীজ ছিল না তখন , নৌকা করে পারাপার হোতো । 

ফিরে গল্প জমে উঠল ওদের কোয়ার্টারে । রিন্তাদির শাড়ির সংগ্রহ অসাধারণ। মন্দির দেখে ফেরার পথে রিন্তাদি আর অসীম দার তত্ত্বাবধানে শাড়িও কেনা হল । এমনকি টাকা কম পড়িয়াছিল , অসীম দা কিছুতেই শুনল না সাথে রিন্তাদির জোরাজুরিতে নেওয়া হল শাড়ি ... স্বর্ণচরি । ফিরে এসে মানিঅর্ডার আর চিঠি লিখেছিলাম অসীমদাকে । তখন জি পে কোথায় ??

রিন্তাদির কাছেই প্রথম জেনেছিলাম...বালুচরি , স্বর্ণচরির আসল দেশ বিষ্ণুপুর নয় , আদি দেশ এই অঞ্চল, যার নাম একদা ছিল বালুচর । নবাবের বেগম যে নক্সার শাড়ি পরবেন তা যাতে অদ্বিতীয় থাকে , তাই একখান শাড়ি তৈরির পরেই তাঁতির আঙুল কেটে দেওয়া হত ... আতঙ্কিত তাঁতি পরিবার দেশ ছাড়তে শুরু করল । তারা জাকিয়ে বসল বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে । কালের গর্ভে চাপা পড়ল বালুচর । আর সেই বালুচরের বালুচরিতে নাম কিনল বিষ্ণুপুর ।  

 তিন খান শাড়ি বগলদাবা করে ওদের বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল । তারপর খাই দাই পাঠ মিটতে মিটতে হল রাত সাড়ে দশটা । কলকাতা নয় , কাজেই বেশ রাত । খাওয়ার পর বেরলাম ... অসীম দা শুরুতেই স্পীড তুলে দিল তুঙ্গে ... এটা বিকেলে ঘুরতে বেরিয়েও দেখেছিলাম। ভয় করলেও, তখন বয়সটা অনেক কম , তাই একটু পরেই ভয় চলে গেল । স্টেট হাইওয়ে দিয়ে চলেছি , বৈদ্যুতিক পোস্ট নেই বা থাকলেও আলো নেই ... চরাচর ব্যপ্ত চাঁদের আলো । হঠাৎই অসীমদা গাড়ি থামিয়ে , স্টার্ট বন্ধ করে দিলো ... বলল ... এবার দেখো । 

মুগ্ধ হয়ে দেখলাম ... বাঁপাশে দাঁড়িয়ে বিশাল কাটরা মসজিদ চত্বর...ঘড়িতে তখন ঠিক রাত ১১ টা । চাঁদের আলোয় কাটরা মসজিদ !!! কি যে অপূর্ব লাগছিল ... বলে বোঝানো যাবে না । রাস্তার ওপরেও আরো একবার গাড়ি থামিয়ে ছিল .... ১১ টা পেরিয়ে আরো কিছু পরে আমরা ফিরলাম হোটেলে । 

পরেরদিন আরো কিছু ঘোরাঘুরির পর্ব চলল ... কাসিমবাজার রাজবাড়ি ও আর্মেনিয়াণ চার্চ , সমাধিস্থল । সে সবও প্রদীপের টাঙ্গা করেই ঘুরেছিলাম । 

আমার সহকর্মী বেবীদির দিদির বাড়ি মুর্শিদাবাদে। দিদি নেই অনেক বছর । জামাইবাবুর পরিবার ওখানকার জমিদার । তিনিও আমাদের সাথে এসে দেখা করেছিলেন । পরের বার যখন পুপেকে নিয়ে গিয়েছিলাম, মনোজদা আমাদের সাথে পুরোটাই ছিলেন । বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে গল্প পরে হবে কখনো । 

দুবার মুর্শিদাবাদ গিয়ে , দু রকম গল্প নিয়ে ফিরেছি । দুটোর কোনটাই কম আকর্ষণীয় নয় ।

Sunday, 2 March 2025

 আপদ বিপদ 

শীত যখন যায় যায় ... হঠাৎই নজরে ধরা দিল পুপে দেবী ভয়ানক ভাবে মাথা চুলকাচ্ছে !!!! কি কাণ্ড?? তবে কি এই বিপদের মধ্যে আপদ হাজির মাথায় ??? 

  আপদই বটে , সত্যিই স্কুল জীবনে এ ধরনের আপদের বিপদে নিজেও পড়েছি , মাকে ও ফেলেছি। মা বলতেন যে আমার দিদিমার মাথা নাকি বেশ গরম (স্বভাব ঠাণ্ডা ই ছিল)ছিল , সে কারণে তেনারা মাথায় ঘাঁটি গেড়ে ঘোট পাকাতে পারতেন না । এবার সে সত্য মাথা দিয়ে বুঝলাম। আমার গরম মেজাজের কন্যার মাথা পুরো উকুনের পোল্ট্রি ফার্মে পরিণত তখন। আমার মাথার দখল নিলেও , দখলদারী জোরালো হলো না , স্কুল জীবনের মতন ঠাণ্ডা , চিন্তামুক্ত মাথা আর নেইকো । বুঝলুম সে কথা।

পরিচিত এক বৌদি বললেন অবাক বিস্ময়ে , তুমি ওর চুল বেঁধে দাও, দেখতে পাওনি ?? না , সত্যিই ওসব জানার পরও খুঁজে পেতাম না । অনেকটা পরীক্ষার হলে টোকাটুকি বুঝতে না পারার মতন বা বুঝলেও ধরতে না পারি র মতন । কি গেরো !! টোটকা , নিদান , ওষুধ ... যে যে , যা যা নিদানের বিধান দিলেন একটা বাদে সব চালু করে দিলাম। 

 বাদ দেওয়া নিদান শুনে , আমি যারপরনাই রেগে আগুন হয়েছিলাম ... পুপেকে নেড়ু করায় আমার মত নেই , তাও একদিন তেমন সম্ভাবনা নিয়ে ছেলের সাথে আলোচনার সময় পুপের মামমাম মানে আমার এ বাড়ির মা( ওনারও মত নেই) নাতনির সাথে সাথে আমাকেও নেড়ু করার প্রস্তাব দেন .. শুনে আমার প্রথমেই মনে হলো খান কয়েক আপদ ওনার মাথায় দান করে আসি , তারপর .... তিন জনে লাইন দিয়ে নেড়ু হয়ে ছবি upload করলে কেমন হয় ???? 😡😡😡

   থাক !! ওসব ভাবনা বাদ দিলুম ... আদি বাবুর মাম্মি নিয়ম করে মাঝে মাঝেই তেল মাখিয়ে , বেছে ( 🙄), শ্যাম্পু মাখিয়ে চান করিয়ে দিয়েছে পুপেকে। আমি( কম) আর পুপের রীমা দিদি ও নিষ্ঠা ভরে আপদ বিদায়ে রত ছিলাম । পুপে ক্লাস শেষ করে ব্যাগ নিয়ে ওদের বাড়ি চলে যেত নির্ধারিত দিনে । 

 প্রশ্ন হলো আপদেরা এলো কোথা থেকে ?? বলা মুশকিল!! ওই সময়ে এরা বেশ দল বেঁধে আবাসনের নিচে কখনও সকালে ( ১১টা) , কখনো বিকেলে খেলায় মেতে উঠতো !! 

   এক বান্ধবীর মা নিদান হিসেবে কেরোসিন মাখাতে বলেছিল ... অব্যর্থ নাকি !! এরা গোল বাধালো ... মনে হচ্ছিল কেরোসিন দেশলাই সব যেন ব্যবহার করবো !!! কি যে ভাবে আমাকে ???? 

    চুল ঘচাং ফু করা হল , স্ট্রেটনার দিয়েও নিধন পর্ব চলল । বিছানায় শোয়ার দিক পরিবর্তন হল , মাথা আর পা বিপরীত দিকে ন্যাস্ত করা হল , একদিন পুপের পায়ের শটে নাকে চোট , একদিন আরেকজনের মুখে চোট ... কিন্তু বিপদ এক রাতে মারাত্মক জায়গায় পৌঁছল ... পরের দিন চোটপাট করে , রণে মানে আমার সাথে শোয়ায় ভঙ্গ দেওয়ার ভয় দেখানোও হজম করলাম ... কি করব !!! ঘুমন্ত হলেও দোষ তো আমারই... যদিও আমার পরিচিত দুজন বলেছে ... এ এক মোক্ষম সুযোগের সদ্ব্যবহার... কিন্তু সত্যিই সুযোগ নিয়ে ওসব করিনি ... হয়েছিল কি জানো , স্বপ্নে অবাধ্যতার জন্য পুপেকে পিট্টি ( পেটাচ্ছিলাম ) দিচ্ছিলাম , ঠিক জুতের হচ্ছিল না , সরে সরে যাচ্ছিল স্বপ্নে , যখন মনের মতো মার complete হোলো !!! ঘুম গেলো ভেঙে আর পুপের বাবার গর্জন শুনলাম..." একি রাত দুপুরে খামোখা মারছো কেন ??? " জীবনে প্রথম ওই গর্জনে বিছানায় উঠে বসে ভয়ানক হাসলাম ... একটু বাদে পুপের ঘুম সেই অট্টহাসিতে ভাঙল ... সোনা মুখ করে জানতে চাইল .. " মা তুমি এতো হাসছ কেন ??? " 

কি উত্তর দিই বলো দেখি !!! ঘড়িতে তখন চারটের কাছাকাছি ... হাসি চেপে বললাম... ঘুমা ... পরে বলব । এত কাণ্ড কারখানার পর আপাতত আপদ বিদায় নিয়েছে । ভাগ্যিস !!!

 যাতনা যত

বয়স বাড়ার নানা রকমের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ আছে । তার মধ্যে শারীরিক কিছুর ব্যাপার এবার শীতে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম...এখনো পাচ্ছি । নানাবিধ ব্যাথায় যারপরনাই কেলান্ত হয়ে পড়েছি বটে । সে.....ই পূজোর পর পর কানের কনকনানি পর্ব শেষ হতে না হতেই ঠাণ্ডা কাল  সাথে নিয়ে এলো হাড়ে হাড়ে ব্যথার আলিঙ্গন। কি আপদ !! কি বিপদ !! বেতো রুগীর মতন সর্বাঙ্গে ব্যাথা ...  মনে পড়ল ঠাকুমার ঝুলির সেই সব রাজকন্যেদের কথা , দুষ্টু রাণীদের কথা , যাদের কিনা হাড় মুড়মুড়ি ব্যারাম ছিল । তবে সেখানে তা সারাই করতে প্রাণপাত করত রাজকুমার অথবা স্বয়ং রাজা মশাই । এখন সে রামও নেই,  সে রাজ্যও নেই । ইনি একদমই প্রবচনের রাম,নিদেন পক্ষে রামায়ন খ্যাত  শ্রী রাম চন্দ্র,  কিন্তু কদাপি রাজনৈতিক নয়কো🤫।

তো যা বলছিলাম,  মনের ব্যথা, মাথার ব্যথা, পেটের ব্যথার ও কানের ব্যথার পর নতুন সংযোজন হাড়ের ব্যথা । মাথার ব্যথার এক ধরনের কারণে সেই ছোটকালে চশমা ধারণ করতে হয়েছিল । আরো অনেক কারণ সমুদ্রে সে তার অংশের কাজ করে চলেছে , সেই  থেকে । আমার কর্তার মতে মাথা থেকে ব্যথার গতি যখন নিম্নগামী তখন তা শিগগিরই দেহ থেকে বেরিয়ে যাবে ...নামতে নামতে । এ সব কথায় বড়ই ব্যথা পাই মনে .... । 

শুরুর দিকে মাথার ব্যথার কার্যকারণ পরম্পরা শোনার পর আমার কর্তা মশাই,  হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিজের অপারগতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন,  বলেছেন এতো রকম বেরকম কারণের দামী মাথা ব্যথার উপশম করার ক্ষমতা তার কেন ? কারও নেই কো 😟 !!! 

চোখের জ্যোতিও স্বাভাবিক নিয়ম মেনে কিঞ্চিত ক্ষতিগ্রস্ত,  তাই নাকের ওপরে চশমা না আঁটলেই অক্ষর কেন পিপিলিকার সাথে তুলনীয় .... একদম পোস্কার বুঝতে পারি ইদানিং।

কিন্তু এবার পুরো হাতে হ্যারিকেন কেস, করতেই হবে ফেস।

সামনেই জন্মদিনের হাতছানি , এরই মধ্যে বেশ ওজনদার আর বিখ্যাত মানুষ জনের হাড়ের ব্যমো হাতে এসেছে উপহার স্বরূপ। any guess ?? পারলে না তো ?? টেনিস এলবো ... আহা কি জম্পেস একখান্ নাম বলো দেখি !!! কর্তা মশাই আন্দাজ করছিলেন , তাও জুনিয়র বন্ধুর কাছে দেখিয়ে নিশ্চিত হয়ে কেমন যেন চিন্তিত হলেন , বলতে নেই,  দেখে মনের ও হাতের দুই ব্যথাই কেমন যেন কম কম লাগল সেই মাহেন্দ্রক্ষণে !!!

 বিখ্যাত খেলোয়াড়দের এমন হয় বল( ball) পেটাপেটি করে , অনেক কসরত করে অর্জিত , আমার কেন হলো ক্যায়া মালুম ?? ফোন টেপাটেপি করে ??? অতএব  ফোনে মন দানকারী মহিলা মহল(?) সাবধান!! সাবধান!! সাবধান!!

দুষ্টু লোকের ধারনা অনুযায়ী ওই কাজটি খুব মন দিয়ে করে থাকি আর বাকি কাজের জন্য তিনি স্বয়ং আছেন with আম গায়ের লোক ( আম আদমি 🤫রাজনৈতিক নয়কো🙏) ।

হাতের সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে আরো এক অঙ্গ  সঙ্গ দিয়েছে , কিন্তু তার কথা পরে একদিন বলব । হাতের একখান গয়নাও শিগগির হাতে আসবে , তাতেই নাকি ফল পাবো হাতে নাতে .... দেখা যাক.... দিল্লী আভি দূর হ্যায় ।।

 ফেল ফেল মে 

আমাদের চির পরিচিত, প্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র প্রদোষ মিটার বা প্রদোষ মিত্রর ডাক নাম যে কেন ফেলু হল, সে ভাবনা মাঝে মাঝেই পেয়ে বসে আমাকে । কারণটা হয়তো কোথাও লিপিবদ্ধ আছে , যা হয় পড়ে মনে রাখতে ফেল করেছি , নয়তো পড়িনি অথবা নেই হয়তো । যার ওমন ঝাঁ চকচকে মগজাস্ত্র তার নাম কিনা ফেলু ?? তবে নামের মানে আর কবেই বা আমরা ঠিক মতন মেলাতে পেরেছি !!! 

তো কথা হচ্ছিল ফেল নামক ভীষম এক বিষয় সম্বন্ধে । আমার মাকে , মাঝে মাঝেই বলতে শুনতাম," জীবনে ডাহা ফেল করে গেলাম।" ছোট ছিলাম, বুঝতাম না । একটু বড় হলে স্কুল কলেজের ফেল নামক ভয়ের বিষয় জানলাম । বুঝলাম যে বিষয়টা শুধুই ভয়ের নয় , বেশ লজ্জারও বটে । মা বাংলা সাহিত্য নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির অধিকারিনী ছিলেন , কাজেই প্রথম প্রথম মায়ের ফেল নামক বিষয় বোধগম্য হোতো না । জীবনের পরীক্ষা আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা যে ভিন্ন, তা যখন বুঝতে শিখলাম তখন সব বুঝে , বোঝাই হলাম । 

এখন কন্যা রত্নটিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফেল নামক বিষয়টি কি , তা বোঝাতে ফেল করে যাচ্ছি । পড়াশোনার প্রতি তার ঝোঁক বলো , উৎসাহ বলো সবই কেমন যেন নেতিবাচক । যা সে পড়ে , তা বাবার হুঙ্কার , পিট্টি আর মায়ের যোগ্য সঙ্গতে সম্পন্ন হয় 😔

তাকে যখন‌ই বলা হয় ..." ওরে এমন করিস না , একটু পড়ায় মন দে , ফেল করে যাবি তো !!! অবাক চোখে তাকায় , দৃষ্টির ভাষায় জিজ্ঞাসা ... "সেটা আবার কি ?? খায় না মাথায় দেয় ? নাকি অঙ্কের মতন বিপদ-আপদ জনক !!! " বোঝানোতে তার মায়ের ধৈর্য আর জুড়ি নিয়ে কোন কথা হবে না .... বৃথা বোঝানোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে , উচ্চ রক্তচাপ আরো উর্ধে তুলে বোঝানো চেষ্টা করি ... "ওরে , ছোট পুপের (আরেক পুপে , যে ওর বাবার বন্ধুর কন্যা )ক্লাসে নামিয়ে দেবে তোকে , এক ক্লাস নিচে । ওর সাথে পড়তে হবে তোকে ।" আমার বীরাঙ্গনা ভয়ানক রেগে উত্তর দেয় ... " কে নামাবে ? আমি কি ছোট ? যে কোলে করে নামিয়ে দেবে ? আমি নামবই না । ব্যাস্ ।" ... নাও এবার বোঝো ঠেলা !!! 

একদা এই লজ্জার বিষয় বোঝার পরও লাল ঢ্যারা আর গার্জেন কলের বার্তা নিয়ে ভয়ে আধমরা হয়ে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছিলাম। মায়ের মুখ আঁধার। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল বলে কথা !!! নতুন ক্লাসে উঠেছি , কিন্তু ... মাকে নিয়ে ক্লাস টিচার মধুমিতাদির দরবারে হাজির , মুখে চোখে লজ্জা আর ভয় । কাছে ডেকে মধুমিতা দি বললেন ... এত বিষয় ছেড়ে এই বিষয়ে ডিগবাজি খেলি ?? ভাবছো তো, কি বিষয় ?? স্কুলের ইতিহাসে ওই আলোড়ন সৃষ্টিকারী ফেল প্রথম আর সম্ভবত শেষ । অবাক হবার কিছু নেই... ডিগবাজি খেয়েছিলাম ফিজিক্যাল এডুকেশন বা পি.টি তে ।

যোগ ব্যায়াম করতে আমার ভয়ানক ভয় ছিল , সেই ভয়েই স্কুলে মৈত্রেয়ী দি আর মমতা দিকে দেখলেই হাত পা কাঁপত । মা পরের পরীক্ষার আগে , আমার এক জুনিয়র বন্ধুর মায়ের সহায়তায় খুঁজে বের করেছিলেন এক যোগ ব্যায়ামের স্যারকে । পরে ব্যায়ামের সাথে আরো কিছু সাধারণ ফ্রি হ্যাণ্ড কসরত ও অন্যান্য আরো কিছু ড্রিল থাকায় এরপরে আর ওই লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়নি । 

দৌড়ঝাঁপ থেকে চিরদিনই মাপ চেয়ে , ঔদিকের ঝাঁপ বন্ধ রেখেছি । এখন ওজনদার হওয়ার জন্য মাঝে মাঝে উৎসাহ নিয়ে হাত পা ছুড়ি ... কিন্তু কদিন পরেই উৎসাহ শূন্যের ঘরে আর আমার আবার সেই পঞ্চম শ্রেণির মতন ডিগবাজি বা ফেল । তাই ফলাফলও শূন্যের ঘরে ।

Friday, 28 February 2025

 এবারের মুক্তি ... মাইথন


গতানুগতিকতার থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড় থেকে একটু হাপ ছাড়তে গত ২৫ শে জুলাই ২০১৯ রবিবার আমরা বেরিয়ে পরলাম। এবারের গন্তব্য বাঙালির অত্যন্ত পরিচিত মাইথন। রাঢ় বাংলা আর ঝাড়খণ্ডের বর্ডারে অবস্হিত এই মাইথন। আসানসোল স্টেশনে নেমে ৩০/৪৫ মিনিটের পথ। আমরা হাওড়া থেকে রবিবার সকালে ব্ল্যাক ডায়মন্ড ( হাওড়া- ধানবাদ ) এ করে , র‌ওনা দিলাম। কাটায় কাটায় ৬.১৫ মিনিটে ট্রেন ছেড়ে দিল। যথা সময়ে আসানসোল পৌঁছলাম। কিন্তু আমরা ওই স্টেশনে না নেমে কয়েক স্টেশন পরে কুমারডুবি তে নামলাম। আগে ই জেনেছিলাম যে কুমার ডুবি থেকে মাইথনের দূরত্ব কম। কুমারডুবি ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত । আসানসোলের পর ই ট্রেন ঝাড়খণ্ডে ঢুকে পড়ে। প্রায় সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ স্টেশনে নেমে অটো করে আমরা মিনিট ১৫/২০ এর মধ্যে আমরা West Bengal Tourist lodge এ পৌঁছলাম। শহরের মধ্যে দিয়ে দোকান বাজার পেরিয়ে মাইথন ড্যামে যখন উঠলাম , তখন দামোদর নদের ব্যাপ্তি তে মুগ্ধ না হয়ে উপায় ছিল না। ড্যামের যে দিকে জলাধার , সেদিকে ছোট ছোট একাধিক দ্বীপ দেখতে পেলাম। ওমন ই এক দ্বীপের মাঝে DVC এর  পর্যটন লজ "মজুমদার নিবাস "। ছোট একটা ব্রীজ পেরিয়ে ওই লজে প্রবেশ করতে হয়। এ সব পেরিয়ে , ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর বাংলো যাওয়ার রাস্তা ছাড়িয়ে ছোট্ট টীলার ওপর টুরিস্ট লজে এসে পৌঁছলাম। লজের পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বেশ শান্ত। পিছনে জঙ্গল , সামনে লজের বাগান , বাগান সংলগ্ন কয়েক টি কটেজ ( কটেজে সিঁড়ি দিয়ে একটু নীচে নেমে ঢুকতে হয়), বাগান এর সামনে , নীচে ফাঁকা জমি পেরিয়ে বিস্তত দামোদরনদ , মধ্যে মধ্যে জেগে থাকা দ্বীপ , জল থেকে মাথা তুলে দাড়ানো ছোট ছোট পাহাড়....পাড়ে বাঁধা ডিঙ্গি নৌকা।পরে শুনলাম ওই নৌকা পর্যটকদের নৌবিহারের জন্য রাখা আছে। স্পীড বোট ও রয়েছে।

‌মাইথন শব্দটি এসেছে মায়ের থান .. এই শব্দের অপভ্রংশ থেকে। এখানে কাছেই মা কল্যাণীশ্বরী র মন্দির। এর নামেই জায়গার নামকরণ । মা খুব ই জাগ্রত। সন্তানহীনা জননীর দুঃখ দূর করেন। 

আমাদের ঘরটি ছিল দোতলায়। চ‌ওড়া বারান্দা র একপাশে। বিশাল ঘরের লাগোয়া বাথরুম, ড্রেসিং রুম ও কাচঘেরা নিজস্ব বারান্দা । সামনে বিস্তৃত দামোদর নদ। এই সেই বিখ্যাত নদী যা একসময় ছিল বাংলার দুঃখ। কথিত আছে .. " দামোদরের এলো বাণ , ডুবল শহর বর্ধমান।" শুধু বর্ধমান নয় সংলগ্ন এলাকা ভাসিয়ে ভয়াবহ বন্যা হতো। পরবর্তী কালে কয়েক টি বাঁধ নির্মাণ করে সেই ভয়াভয়তার কবল থেকে মুক্তি মেলে। দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) এর তৈরি বাঁধ গুলির মধ্যে মাইথন ড্যাম অন্যতম। আরো একটা কারণে সেই ছোট বেলা থেকেই এই নদীর নাম আমাদের চেনা .... হ্যাঁ , ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন , মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য।

বাঙালির জীবনে আরেক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ উত্তম ময় চলচ্চিত্র জগত। হ্যাঁ, উত্তম কুমার। এখানে এসে জানলাম "শঙ্খবেলা " সিনেমার সেই নৌকায় উত্তম-মাধবী জুটির অসাধারণ গানের ভিতর দিয়ে রোমান্টিক প্রশ্নের উত্থাপন ' কে প্রথম কাছে এসেছি ? কে প্রথম চেয়ে দেখেছি? কিছুতেই পাই না ভেবে , কে প্রথম ভালোবেসেছি !! তুমি না আমি ?".... এই গানের চিত্রায়ণ এই দামোদর নদের বুকে ই। সেই নৌকা বহুদিন যত্নে রক্ষা করেছিল সেই সৌভাগ্যবান মাঝি... এ তথ্য আমার এক মামীর কাছে শুনেছি। ওই সময়ে তিনি মামার সাথে ওদিকে ই থাকতেন। মামার কর্মস্থল ছিল সীতারাম পুর।

দুপুরে গরম গরম মাংস ভাত খেয়ে উঠে , একটু আসেপাশে ঘোরাফেরা করার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সবাই লম্বা ঘুম দিলাম। সন্ধ্যায় অন্ধকার নেমে চারিদিক যখন নিস্তব্ধ , তখন নামল অঝোর ধারায় বৃষ্টি ... বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই নৈঃশব্দ কে ছাপিয়ে যাওয়া ঝিঁঝিঁ র কনসার্ট শুনতে শুনতে আর বিদ্যুৎ চমকের মধ্যে দৃশ্যমান জলের রেখার আভাস দেখতে দেখতে কখন যেন রাতের খাবারের সময় এসে গেলো। সন্ধ্যায় যদিও চায়ের সঙ্গে অল্প গরমাগরম চিকেন পাকোড়া ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া হয়েছিল ... কিন্তু বেড়াতে বেরলে আমার ক্ষিদে একটু বেশি ই পায় !!!

রাতের খাবারের পালা শেষ করে , একটু জলদি ই আমরা শুয়ে পড়লাম, পরেরদিন একটু ঘোরার প্ল্যান রয়েছে। খুব ভোরে ওঠার তাড়া নেই। বেড়াতে এলে মনটার সত্যিই একটু মুক্তি মেলে। সাতসতের কাজের থেকে মুক্তি।

পরদিন সকালে চা পেতে একটু দেরি হলো। আমরা একমাত্র বোর্ডার .... তাই টুরিস্ট লজের কর্মীরা ও একটু আয়েশ করে দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছেন। একদুজন রাতে লজেই থাকেন ও ম্যানেজার লজ সংলগ্ন কোয়ার্টারে থাকেন বাকিরা কাছাকাছি থাকেন। এখানকার স্টাফদের অধিকাংশ ই বাইকে যাতায়াত করেন। ব্যাবহার খুবই ভালো। 

জলখাবার খেয়ে নিয়ে আমরা ম্যানেজারের ঠিক করা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমেই গেলাম মা কল্যাণীশ্বরী মন্দির দর্শন করতে। ছিমছাম , ছোট্ট মন্দির। পূজো দেওয়া নয় , দর্শন ই আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল। পূজো দেওয়ার অনুরোধ এসেছে, কিন্তু তা বিরক্তি উদ্রেক করেনি। মন্দির চত্বরে পায়রা দের অবাধ বিচরণ । দর্শনার্থীদের ভিড় দেখলাম তাদের কিছু মাত্র বিচলিত করছে না। বেশ লাগল। মায়ের দর্শন করে নির্বিঘ্নে আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। এবার আমাদের গন্তব্য snake park হয়ে পাঞ্চেত ড্যাম দেখে নিয়ে , পুরুলিয়া জেলার গড়পঞ্চকোট ।সেখান থেকে আবার মাইথন ফেরা।

আমরা snake park এ পৌঁছলাম। একটু হতাস হলাম ওখানে গিয়ে । অজ্ঞাত কোন কারণে , ওখানে কোন সাপের দেখা মেলে নি। শুনলাম সাপ আগে ছিল। এখন জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। হয়তো বা Forest Department এর তরফ থেকে কোনো বাধা আছে ... জানা নেই। 

এবার আমাদের গন্তব্য পাঞ্চেৎ ড্যাম। কিছু ক্ষণের মধ্যে ই আমরা ড্যাম দেখতে পেলাম। ড্যামে ওঠার বেশ খানিকটা আগে গাড়ি থেকে নেমে চারদিকটা দেখে মুগ্ধ হলাম। দামোদর নদের বিস্তার ... জলে আকাশের মেঘের প্রতিফলন , তীরে বাঁধা ডিঙি নৌকা সব ই যেন পটে আঁকা ছবি। ওখানে পাশেই একটা সিঁড়ি নেমে গেছে নদীর কাছে। সেখানে আমরা তিনজনে নেমে একটু জল মাথায় ছুঁইয়ে এলাম। ঝকঝকে রোদের গরমে জলের শীতল পরশ বড়ো ভালো লাগলো। ওপরে এসে আসেপাশের কিছু ছবি ক্যামেরাবন্দি করলাম। এবার গাড়ি এগিয়ে চলল ড্যাম পেরিয়ে গড় পঞ্চকোটের উদ্দেশ্যে।

 গড়পঞ্চকোট নামের মধ্যে ই যেন ইতিহাসের গন্ধ রয়েছে। কিন্তু তেমনভাবে ইতিহাসের খোঁজ পাওয়া ই গেলো না। এখানেই আমরা পিছিয়ে রয়েছি। যদিও পর্যটন শিল্পের অনেক উন্নতি আমাদের রাজ্যে হয়েছে, কিন্তু আরো যত্নবান হওয়া বোধহয় উচিত। অন্য কিছু সূত্রে সামান্য কিছু সন্ধানে সক্ষম হলেও মন ভরলো না। জানলাম , একসময় পাঞ্চেৎ পাহাড়ে একটি কেল্লা ছিল। যা মারাঠা দস্যু বর্গীদের দ্বারা বারংবার আক্রান্ত হয়, ওই কেল্লা বা গড়ের রাজার মৃত্যু হয়। রাজার সাত রানী স্বেচ্ছা মৃত্যু বরণ করেন। কেল্লা ও ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। তখন বাংলায় নবাব আলীবর্দী খাঁর সময়কাল। 

ওখানে পৌঁছে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কিছু ধ্বংসাবশেষ দেখলাম। সংরক্ষণের অভাবের ছাপ ছড়িয়ে আছে। একমাত্র রাধাকৃষ্ণ মন্দির টি অক্ষত রয়েছে। কাছে ই একটি watch tower রয়েছে। আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছিল, অগত্যা tower এ ওঠা মুলতবি রেখে, আমরা ফেরার পথ ধরলাম। আসা যাওয়ার রাস্তা ভালোই। হোটেলে ফিরে সেদিন আর আমরা কোথাও বেড়াতে গেলাম না।

পরেরদিন সকালে নৌকা ভ্রমণ না করলেই নয়। চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এক হোটেল কর্মীর ভাই এর নৌকা। নদীর ধারের অখ্যাত এক ঘাটে পৌঁছলাম .... সে অভিজ্ঞতা ও বেশ অন্যরকম। হোটেল থেকে বেরিয়ে দেখি আমাদের ঘাটে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুটো বাইক হাজির। বোঝো !! এ তো আর সপ্তপদী রাইড নয় !!! ভয়ে ভয়ে সামনের বাইকে একটু টালবাহানার পর আমি আর আমার কন্যা উঠলাম চালকের পিছনে আর অন্য বাইকে আমার কর্তাকে নিয়ে চালক দ্বয় র‌ওনা দিলো। উঁচু ,নীচু , আবার উঁচু ... এভাবে একজায়গায় রাস্তা শেষ হলো। এখানে ও চমক। আমরা নামলাম ব্রিটিশ রাজের তৈরি , পরিত্যক্ত এক Boat club এর সামনে। হোটেল কর্মচারী র কাছে ই শুনলাম .... অতীতের এই Club এর বর্ণাঢ্য সব নৌ প্রতিযোগিতার কথা। নববর্ষের উদযাপন এর অনুষ্ঠানের কথা। সত্যিই অদ্ভুত এই ইংল্যান্ড এর অধিবাসী বৃন্দ.... সুদূর ইংল্যান্ড থেকে শুধু মাত্র বাণিজ্য করতে এসে ,দেশ দখলকারী হিসেবে আমাদের পরাধিনতার গ্লানিতে ডুবিয়েছিল... এ যেমন সত্য , তেমন ই তাদের  থেকে অনেক কিছু ই , যা ভালো, শিক্ষনীয় তার আমরা নিয়েছি এ যাবৎ। নিয়ে চলেছি ও। জীবনকে উপভোগ করতে জানতো ব্রিটিশরা। 

ওই ক্লাব হাউসের মধ্যে দিয়ে গিয়েই পুরোনো পরিত্যক্ত একটা সিঁড়ি পেলাম। বৃষ্টি ভেজা স্যাঁতসেঁতে শ্যাওলা মাখা পথ ধরে সাবধানে নিচে নেমে এলাম ... নৌকা আগেই ওখানে এসে গিয়েছিল। একে একে তিনজনে নৌকায় উঠে সামলে বসে দামোদর নদে নৌবিহার শুরু হলো। হাল্কা স্রোতের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের মধ্যে নৌকা এগিয়ে চলল। বেশ লাগছিল। একসময় আমরা নদের মাঝের সবুজদ্বীপে পৌঁছলাম। পর্যটকদের আনাগোনা র প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে , দেখলাম যত্রতত্র... সেদিন আমরা তিনজন ছাড়া আর কোন পর্যটক তখনো ওখানে আসেননি। কিছুক্ষণ ওখানে কাটিয়ে আবার নৌকা করে ফিরলাম। ফিরতি পথে নদের একজায়গায় জাল দিয়ে ঘিরে রাখা মৎস চাষের ব্যবস্থা ও দেখলাম। অন্য জায়গা থেকে ছোট মাছ এনে পুষ্টিকর খাবার খাইয়ে নানা ধরনের research work এর মাধ্যমে তাদের বড় করা হয়। এদের ব্যবহার করা হয় pisciculture (fish farming )এ। সে সব ও অল্প সল্প কিছু জানার পর , আমরা লজে ফিরে জলখাবার খেয়ে , বেরিয়ে পরলাম। 

সেদিন বিকেলে ই ফেরার ট্রেন। আমরা আসানসোল এ এক দাদার বাড়ি তে জমিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজন ... শয়ন সবের পরে , র‌ওনা দিলাম স্টেশন। তারপর !!! আবার থোড় বড়ি খাড়ার মধ্যে দিনের শেষে ফিরে এলাম। সেই আমার শহর , আমার পাড়া ... অবশেষে আমাদের বাড়ি।

@শুচিস্মতাভদ্র